আই জামান চমক, icrbd24: করতোয়া তখনও বহমান। শীতের ভোরে তার বুকে কুয়াশা জমে থাকে, রোদ উঠলে সেই কুয়াশা সরে যায়, আর জল থেকে যায় স্বচ্ছ, শান্ত, নিজের পথে। নদী কখনো কারো বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয় না। নদী শুধু বয়ে যায়। আমি যতবার করতোয়ার পাড়ে দাঁড়িয়েছি, ততবারই মনে হয়েছে, সাংবাদিকতাও তো এমনই হওয়ার কথা ছিল। স্বচ্ছ, নির্ভীক, নিজের পথে বহমান।
সাংবাদিক হরিশ রায়কে আমি কখনো সামনে থেকে দেখিনি। করমর্দন হয়নি, চা খাওয়া হয়নি এক টেবিলে বসে। কিন্তু তাকে আমি চিনি। তার কর্মকে আমি দেখেছি, তার লেখার ভেতর দিয়ে তার চেতনাকে অনুভব করেছি। আর কখনো কখনো একজন মানুষকে চেনার জন্য সামনাসামনি বসার দরকার হয় না, তার কলমই যথেষ্ট হয়ে ওঠে।
যে মানুষ ক্ষমতার এত কাছাকাছি থেকেও ক্ষমতার ফল কখনো চাননি, সেই মানুষকে চেনা কঠিন কিছু নয়। হরিশ রায় সেই বিরল মানুষদের একজন। ক্ষমতার আঙিনায় হাঁটাচলা করেও তিনি নিজের হাত প্রসারিত করেননি লোভের দিকে। তিনি চেয়েছেন শুধু একটা জিনিস, এই জনপদের মানুষ ভালো থাকুক। মুসলিমেরা ভালো থাকুক, হিন্দুরা ভালো থাকুক, সবাই মিলেমিশে থাকুক একই মাটির উপর। এত সহজ একটা চাওয়া, অথচ আজকের বাংলাদেশে এই চাওয়াটুকুই যেন অপরাধের নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, সত্যকে সহজ করে বলবার নামই সততা। হরিশ রায়ের লেখায় অথবা তার বক্তৃতায় আমি সেই সততাই দেখেছি। জটিলতা নেই, ভনিতা নেই, শুধু সত্য বলার সাহস আছে। আর সাহসের একটা মূল্য থাকে। এই মূল্য তাকে দিতে হয়েছে বারবার। তাকে বলা হয়েছে গুপ্তচর, তাকে বলা হয়েছে উস্কানিদাতা। তার নামে ছড়ানো হয়েছে একের পর এক প্রপাগান্ডা। যে মানুষটা সারাজীবন সম্প্রীতির কথা বলে এসেছেন, তাকেই দাঁড় করানো হয়েছে বিভাজনের কাঠগড়ায়। এর চেয়ে বড় অবিচার আর কী হতে পারে?
বাতাসে এমনভাবে বিষ ছড়ানো হয়েছে যে, কিছুদিন আগে একটা ফেসবুক পোস্টে দেখলাম, হরিশ রায় লিখেছেন, তিনি হয়তো লেখালেখির জগত ছেড়ে দেবেন। পড়ে বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। একজন সৎ মানুষকে যখন তার নিজের ভূমিতে দাঁড়িয়ে সততার জন্য মূল্য দিতে হয়, তখন এই প্রশ্নটা তো উঠবেই, তবে সততার পরিণতি কি এই হওয়ার কথা ছিল?
না, দাদা। আপনার কলম থামতে পারে না।
যদি আপনি এই জগত ছেড়ে যান, তাহলে যারা অপপ্রচার ছড়িয়েছে, যারা সত্যকে বিকৃত করার খেলায় মেতেছে, তারাই জিতে যাবে। আর এটাই তো তাদের আসল লক্ষ্য ছিল। একজন সৎ কলম যোদ্ধাকে থামিয়ে দেওয়া, একজন সাহসী কণ্ঠকে চুপ করিয়ে দেওয়া। আপনি যদি থেমে যান, তাহলে এই যুদ্ধে আপনি হারবেন না, হারবে গোটা জনপদ। হারবে সেই মানুষগুলো, যারা এখনো বিশ্বাস করে সাংবাদিকতা মানে নিরপেক্ষ সত্য বলার সাহস, কারো তাঁবেদারি নয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে যে সৈনিক গুলির শব্দে ভয় পেয়ে অস্ত্র ফেলে দেয়, ইতিহাস তাকে মনে রাখে না। যে সৈনিক গুলিবিদ্ধ হয়েও দাঁড়িয়ে থাকে নিজের অবস্থানে, ইতিহাস তাকেই মনে রাখে। আপনি এই লড়াইয়ের একজন সৈনিক, হরিশদা। আর সৈনিক কখনো মাঠ ছেড়ে পালায় না।
চার্চিল একবার বলেছিলেন, সাফল্য চূড়ান্ত নয়, ব্যর্থতা মারাত্মক নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো চালিয়ে যাওয়ার সাহস। আপনার কথা বা লেখা যদি কারো অসুবিধার কারণ হয়, তার মানে আপনি ঠিক জায়গাতেই আঘাত করেছেন। সত্যের কলম সবসময় কারো না কারো গায়ে লাগে। এটাই সত্যের স্বভাব।
আমরা আছি আপনার সাথে, হরিশদা। এই মাটির মানুষেরা আছে আপনার সাথে। যারা এখনো বিশ্বাস করে মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান সবাই মিলেই এই দেশ, তারা সবাই আছে আপনার পাশে। প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিক, যে এখনো সত্যকে সত্য বলার সাহস রাখে, সে আপনার পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে।
করতোয়ার জল যেমন কখনো থেমে থাকে না, বাধা পেলেও পথ খুঁজে নেয়, আপনার কলমও তেমনি বয়ে চলুক। মানুষের পক্ষে কথা বলুন, যেমনটা আপনি সবসময় বলে এসেছেন। কারণ এই সময়ে, এই দেশে, সত্য বলার মানুষের বড় বেশি প্রয়োজন। আপনার নীরবতা নয়, আপনার কণ্ঠস্বরই এই জনপদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
অবিচল থাকুন, দাদা। যেমন ছিলেন, তেমনই থাকুন।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839