• বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ০৫:০০ অপরাহ্ন
শিরোনাম
বীরগঞ্জে র‌্যাবের অভিযানে ১৬ ইঞ্চির প্রাচীন বিষ্ণু মূর্তি উদ্ধার, পাচারকারী চক্রের ২ সদস্য গ্রেফতার টাকা তো দেবেই না, ধন্যবাদও দেবে না? সাবেক মন্ত্রী সামাদ আজাদ মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে বীরগঞ্জে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, জালে ৩ ব্যবসায়ী পেশাদার মর্যাদা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে ডোমারে ঔষধ কোম্পানি প্রতিনিধিদের মানববন্ধন বই যার বন্ধু, সে কখনো একা নয় খেলার মাঠ উন্মুক্তের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন, ডিসিকে স্মারকলিপি লালমনিরহাটের গণধর্ষণ মামলার আসামি রংপুরে গ্রেফতার দেবীগঞ্জে লাভজনক ফসলের খোঁজে চিয়া সিড চাষ শুরু করলেন কৃষক খোরশেদ আলম পঞ্চগড়ে ভুট্টা চাষে সফলতার গল্প, সার্কেল সীড কোম্পানির মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত⁠ হারানো বিজ্ঞপ্তি: দেবীগঞ্জের মানসিক ভারসাম্যহীন মহিলা

বই যার বন্ধু, সে কখনো একা নয়

আই জামান চমক, ঢাকা
মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

আই জামান চমক, icrbd24:দেবীগঞ্জের গালামাল দোকানে তখন পুরানো পত্রিকা বিক্রি হয় কেজি দরে। মশলার দোকানদাররা নেয় মশলা মুড়িয়ে দিতে, সবজিওয়ালারা নেয় টমেটো বাঁধতে। আমি নিতাম পড়তে। কেজি দরে কেনা পত্রিকা এ-টু-জেড পড়তাম। বিজ্ঞাপনসহ। পড়া শেষ হলে আবার পড়তাম। বাড়িতে দৈনিক জনকণ্ঠ আসত, কিন্তু আমার ক্ষুধা ছিল অজগরের মতো। একটা পত্রিকায় কুলাত না।

আব্বা চাইতেন আমি ফার্স্ট হই। হতামও। কিন্তু ক্লাসের বই শেষ করে বসে থাকার মানুষ আমি ছিলাম না কোনোদিনই। হাফপ্যান্ট পরা বয়সে সমরেশ মজুমদারের গর্ভধারিণী পড়েছি। শেক্সপিয়র, টলস্টয় ততদিনে ধরেছি। মাসুদ রানার কোনো সিরিজ বাদ দেওয়ার সুযোগ ছিল না, সে যত দূরেই পাওয়া যাক। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প শেষ, শরৎ সমগ্র শেষ। সিনিয়র ভাইবোনদের কাছ থেকে সেমি অ্যাডাল্ট উপন্যাসও চেয়ে নিয়ে পড়েছি নির্দ্বিধায়। স্কুলের লাইব্রেরি থেকে চেয়ে নিয়েছি, মাঝেমধ্যে না বলে নিয়েছি। নিজেই স্বীকার করি, আমি ছিলাম অতি পাকনা।

ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ছনক্ষেতে বা পাটক্ষেতে গাছের ছায়ায় শুয়ে বই পড়তাম। কেউ খুঁজত না সেখানে। সেখানে বসে রবিনহুডের সঙ্গে শেরউড ফরেস্টে ঘুরেছি, রবিনসন ক্রুশোর সঙ্গে নির্জন দ্বীপে রাজত্ব করেছি। সেটা পালানো ছিল না, ছিল ডুব দেওয়া।

একবার সেই ডুব একটু বেশি হয়ে গেল।

বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে গেলাম শান্তাহার স্টেশনে। সোজা বুকস্টলে। কর্মচারীকে বললাম, আলেকজান্ডার দ্যুমার থ্রী মাস্কেটিয়ার দিন, আর সমরেশ মজুমদারের কী কী বই আছে দেখান। কর্মচারী জবাব দেওয়ার আগেই ভেতর থেকে চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন দোকানের মালিক। জিজ্ঞেস করলেন, বইগুলো কার জন্য? কে পড়বে?

বললাম, আমি পড়ব। তবে একটা শর্ত আছে। পড়া শেষে কালকেই ফেরত দেব, অন্য বই নেব। আপনি একটু কম দামে নেবেন?

ভদ্রলোকের মুখ থেকে পানটা পড়ে গেল অথবা ফেলে দিলেন। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথার ওপর থেকে পায়ের নিচ পর্যন্ত দেখলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, সমরেশ মজুমদারের কোনো বই পড়েছ? নাম বলতে পারবে?

বললাম, সাতকাহন, তেরো পার্বণ, স্বপ্নের বাজার, উজান, গর্ভধারিণী। বাকিগুলোর নাম এখন মনে পড়ছে না।

তিনি আরও বিস্মিত হলেন। বললেন, গর্ভধারিণীর কাহিনি বলো। বললাম সংক্ষেপে। তারপর কবিতা শুনতে চাইলেন। আমি ধরলাম, শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই…

তিনি বললেন, তোমার বয়সের ছেলেরা দুই থেকে পাঁচ টাকার ধাঁধার বই বা কৌতুকের বই খোঁজে। তুমি এগুলো খুঁজছ শুনেই কৌতূহল নিয়ে সামনে এলাম।

সেদিন স্টেশনের পূর্ব পাশের ছনি বোর্ডিংয়ে উঠলাম, দৈনিক ষাট টাকা ভাড়ায়। শুয়ে শুয়ে বই পড়ি, চুইংগাম চিবাই। পড়া শেষ হলে দোকানে গিয়ে ডেমারেজ দিয়ে বদলে আনি। চার দিন এভাবে কাটার পর আসম নুরুজ্জামান ভাই আর আব্বা এসে হাজির।

সেই বুকস্টলের ভদ্রলোক স্থানীয় নাট্য সংস্থার সঙ্গেও সম্ভবত যুক্ত ছিলেন। মাঝে মাঝে তাঁর কথা মনে পড়ে। কেউ চিনলে জানাবেন।

এর বহু বছর পরে বইয়ের সঙ্গে আরেকটি স্মৃতি তৈরি হলো। সেটা অন্যরকম জায়গায়।

একটি মিথ্যা মামলায় একদিন পঞ্চগড় জেলা কারাগারে যেতে হলো। জেলগেটে নিয়ম অনুযায়ী আংটি, চেইনসহ সব জমা দিতে হয়। আমি বললাম, ব্যাগ থেকে একটা বই নিয়ে যেতে চাই। এমনিতে আমি বাথরুমেও বই নিয়ে যাই। শুনতে যেমনই লাগুক, সত্যকে গোপন করা আমার স্বভাব নয়। যারা আমাকে জানেন, তারা জানেন আমার বিছানাতেও বই থাকে, ব্যাগেও থাকে। এখন ফোনে থাকে।

কারারক্ষী জেলার মুশফিক স্যারের রুমে নিয়ে গেলেন। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, বইয়ের নাম কী? বললাম, মাইকেল এইচ হার্টের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একশ মনীষীর জীবনী। তিনি বললেন, এটা খুব ভালো বই। বইটা চেক করে দেখে অনুমতি দিলেন। কৃতজ্ঞতা তাঁর প্রতি।

যতদিন জেলে ছিলাম, ভেতরের লাইব্রেরিটা আমাকে ভীষণ আনন্দে রেখেছিল। সত্যি কথা হলো, আরামসে বই পড়ার জন্য জেলখানা চমৎকার একটা জায়গা।

আমদানি ওয়ার্ডে থাকতাম। নতুন বন্দি এলে প্রথম রাতটা সেখানে কাটায়। একদিন এক বাবা এলেন দুই ছেলে নিয়ে। কাঠমিস্ত্রি মানুষ। কাঁদছিলেন। বললেন ফাঁসানো হয়েছে তাদের। প্রতিটি বন্দিই মনে করেন তিনি নির্দোষ, কিন্তু এই মানুষটার কান্নায় অন্যরকম কিছু ছিল। বুঝলাম ভেঙে পড়েছেন। জিজ্ঞেস করলাম, পড়তে পারেন? হ্যাঁ বললেন। বালিশের নিচ থেকে বের করে দিলাম ডেল কার্নেগি সমগ্র।

কিছুক্ষণ পরে নিজে থেকেই বললেন, জেলে আসাটা সার্থক হলো এই বইটির জন্য।

ডেল কার্নেগি সম্ভবত একমাত্র লেখক যিনি বইয়ের ভূমিকায় পাঠককে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন। বলেছেন, কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়ুন, মনে না হলে জানালা দিয়ে ছাইগাদায় ছুড়ে ফেলুন। এমন সাহস কজনের থাকে?

কদিন আগে ভাইয়ের মত বন্ধু অথবা বন্ধুর মত ভাই সাংবাদিক লালন সরকার অর্থনৈতিক মন্দার তুললেন। চারদিকে টানাটানি, অনিশ্চয়তা। লালন ভাই একটু থেমে জিজ্ঞেস করলেন, কী করেছিস এত বছর? মানে, এই যে টিকে আছিস, কীভাবে?

লালন ভাইয়ের জন্য উত্তর হলো, আমি প্রচুর বই পড়েছি। নিয়মিত পড়ি।

হয়তো ভেবেছিলে অন্য কিছু শুনবে। কোনো কৌশল, কোনো যোগাযোগ, কোনো সুযোগের গল্প। কিন্তু আসলে এটাই সত্যি। বই মানুষকে ভেতর থেকে প্রস্তুত করে। সংকটের সময় যে ভেঙে পড়ে না, সে আগে থেকেই কিছু একটা গড়ে রেখেছে। সেই গড়া বেশিরভাগ সময় আসে পড়া থেকে, ভাবা থেকে, বোঝা থেকে।

মালেক ভাই একবার বলেছিলেন, তিনভাবে শেখা যায়, পড়ে, দেখে আর শুনে। কথাটা ছোট, কিন্তু ভেতরে অনেক কিছু আছে। মান্নার একটা সিনেমা আছে, ঠান্ডা মাথার খুনি। সেখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে পায়ের জুতা মাথার তাজ হয়ে যায়। বই পড়লে যা হয়, ভালো সিনেমা দেখলেও তাই হয়। মানুষ চিনতে শেখা যায়। পরিস্থিতি বুঝতে শেখা যায়। কখন কোথায় দাঁড়াতে হবে, সেটা বোঝার চোখ তৈরি হয়।

যারা বই পড়ে না, সিনেমা দেখে না, গান শোনে না, তারা সব সময় নিজেকে বেশি ভাবে, অন্যকে কম। এটা তাদের দোষ নয়, এটা তাদের সীমাবদ্ধতা। গুরু মারা শিষ্য আর ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া আমার স্বভাব নয়। তর্ক করে লাভ নেই। আমি করিও না।

বই মানুষকে ভেতর থেকে প্রস্তুত করে। সংকটের সময় যে ভেঙে পড়ে না, সে আগে থেকেই কিছু একটা গড়ে রেখেছে। সেই গড়া আসে পড়া থেকে, ভাবা থেকে, বোঝা থেকে। মন্দা আসে, যায়ও। কিন্তু যে মানুষ ভাবতে পারে, সে পথ খোঁজে নেয়।

বই যার বন্ধু, সে কখনো একা নয়। জেলেও নয়, ছনক্ষেতেও নয়, মন্দার বাজারেও নয়।

মন্দা আসে। যায়ও। কিন্তু যে মানুষ ভাবতে পারে, সে পথ খোঁজে নেয়।

পৃথিবীতে যা নিয়েই অহংকার করা হয়েছে, তার পতন হয়েছে। যারা বই পড়ে না, গান শোনে না, সিনেমা দেখে না, তারা সব সময় নিজেকে বেশি ভাবে, অন্যকে কম। এটা তাদের দোষ নয়, এটা তাদের সীমাবদ্ধতা। তর্ক করে লাভ নেই। আমি করিও না।

বই আপনাকে কখনো ঠকাবে না। বইয়ের ভেতর দিয়ে অতীতের শ্রেষ্ঠ মানুষদের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাদের সঙ্গে পরিচয় হলে ভবিষ্যৎকেও দেখা যায়, চোখ বন্ধ করেও।

বই যার বন্ধু, সে কখনো একা নয়। জেলেও নয়, ছনক্ষেতেও নয়, মন্দার বাজারেও নয়।

লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839


More News Of This Category