• বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
রূপসায় গুলি করে হত্যাচেষ্টা মামলায় ডিবি পুলিশের হাতে দুই আসামি গ্রেপ্তার খুলনা নগরীর ডাকবাংলা এলাকায় ড্রেন নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগঔ ডিমলায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে বীরগঞ্জে মরিচা হাইস্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত ডোমারে উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল এবং প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত গঙ্গাচড়ায় জমি নিয়ে বিরোধে উঠান বৈঠকে হামলা, অন্তঃসত্ত্বা নারীকে মারধরের অভিযোগে থানায় মামলা কক্সবাজারের পেকুয়া ও কুতুবদিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ পরিদর্শনে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী গঙ্গাচড়ায় যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূ হত্যা: স্বামীসহ ৫ জন গ্রেফতার বীরগঞ্জে ভাবকি কেএফটি ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন ও ট্রাইব্রেকারে হারাগাছের জয় শশুর বাড়ির ১৩ লাখ টাকার গহনা নিয়ে ভাগা ঘরজামাই অবশেষে ধরা

গণমাধ্যমের নৈতিকতা: যখন পথ হারায় বিশ্বাস

সংবাদদাতা:
সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫

আই জামান চমক

গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমকে ধরা হয় সমাজের দর্পণ। এই দর্পণ যখন ধূলিধূসর হয়, অথবা নিজেই যখন অন্ধকারকে প্রতিফলিত করতে শুরু করে, তখন গোটা সমাজব্যবস্থাই এক গভীর সংকটের মুখে পড়ে। যুক্তরাজ্যের বহুল প্রচারিত ট্যাবলয়েড পত্রিকা ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ (News of the World)-এর ১৬৮ বছরের গৌরবোজ্জ্বল যাত্রার করুণ সমাপ্তি আমাদের সেই ঐতিহাসিক সংকটকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ২০১১ সালের ১০ জুলাই, পত্রিকার শেষ সংখ্যায় যখন প্রচ্ছদে বড় অক্ষরে ‘থ্যাঙ্ক ইউ এন্ড গুডবাই’ লেখাটি প্রকাশিত হলো, তখন তা ছিল কেবল একটি পত্রিকার বিদায় নয়; এটি ছিল সংবাদ সংগ্রহের নৈতিক মানদণ্ড এবং জন-আস্থার চরম পতনের এক মর্মান্তিক দলিল।

আমরা যারা সাহিত্য, রাজনীতি ও ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করি, তারা জানি—কোনো প্রতিষ্ঠান রাতারাতি ধ্বংস হয় না। ক্ষয় শুরু হয় গভীরে, অগোচরে। ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ এর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। পত্রিকার সম্পাদকীয় ভাষ্যটি ছিল বেদনাবিধুর সত্যের স্বীকারোক্তি: “খুব সহজ কথায় আমরা আমাদের পথ হারিয়েছি।” কিন্তু এই পথ হারানোর ব্যাপ্তি ছিল সুদূরপ্রসারী এবং ভয়াবহ। একজন রিপোর্টার ও প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারি দিয়ে যে ঘটনার সূত্রপাত, তা খুব দ্রুতই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সেলিব্রিটি, রাজনীতিবিদ কিংবা সাধারণ নাগরিক—কারো ব্যক্তিগত জীবনই যেন নিরাপদ ছিল না তাদের অনুসন্ধিৎসু, কিন্তু অবৈধ দৃষ্টি থেকে।

তবে এই পতন চূড়ান্ত রূপ নেয় যখন জানা গেল, অপহৃত স্কুলছাত্রী মিলি ডাউলারের ভয়েসমেইলও হ্যাক করা হয়েছে। এটি কেবল আইন লঙ্ঘন ছিল না, এটি ছিল মানবিকতার প্রতি চরম অবজ্ঞা। পাঠক তার পছন্দের পত্রিকা থেকে হয়তো বিনোদন ও স্ক্যান্ডাল আশা করতে পারে, কিন্তু যখন সেই পত্রিকা নিহত সন্তানের পরিবারের গোপন কথা চুরি করে, তখন জনগণের হৃদয়ে যে ক্ষোভের জন্ম হয়, তা কোনো ক্ষমা বা অর্থ দিয়ে নিবারণ করা সম্ভব নয়। এটি অনেকটা সেই ঐতিহাসিক সত্যের মতো, যেখানে জনগণের আস্থা একবার টলে গেলে, সিংহাসনও টিকতে পারে না। যেমন, ইতিহাসে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের উপর যখন জুলুম চরমে পৌঁছায়, তখন প্রতাপশালী সাম্রাজ্যও ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর বয়কট ছিল এই পতনের ত্বরান্বিত কারণ। ফোর্ড বা ভার্জিন হলিডেসের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান যখন জনরোষের কারণে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন বোঝা যায়, পুঁজি এবং নৈতিকতা কখনো কখনো একই সমতলে এসে দাঁড়ায়। অর্থের কাছেও যখন নীতি পরাভূত হয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার আর কোনো ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে না। মালিকপক্ষ, নিউজ ইন্টারন্যাশনাল, দ্রুতই পরিস্থিতি বুঝে পত্রিকা বন্ধের ঘোষণা দেয়। কারণ, বাজারে মুনাফার চেয়ে যখন দুর্নামের পাল্লাই ভারী হয়, তখন তাকে বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

পত্রিকাটি জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছিল। পূর্ণ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা বলেছিল, “আমরা সত্যিই দুঃখিত”। এই ক্ষমা প্রার্থনা হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে, সে বিশ্বাস আর ফিরে আসে না। ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ এর এই ঘটনাটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, গণমাধ্যমের ক্ষমতা অপরিসীম, কিন্তু সেই ক্ষমতার সঙ্গে নৈতিক দায়িত্বও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন সাংবাদিক বা প্রতিবেদককে সর্বদা মনে রাখতে হবে, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখা তার মৌলিক দায়িত্ব। কারণ, যদি পাঠকের আস্থা নামক ভিত্তিটি একবার ভেঙে যায়, তবে ১৬৮ বছরের ইতিহাসও তাকে রক্ষা করতে পারে না। আমি মনে করি, এই ঘটনা প্রতিটি গণমাধ্যম কর্মীর জন্য একটি সতর্কবার্তা—নীতিবোধের স্খলন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের পতন ঘটায় না, এটি সামগ্রিকভাবে পেশাটির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে।

-লেখক: কবি, সাংবাদিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী


এরকম আরও সংবাদ