আই জামান চমক, icrbd24: করতোয়া তখনও জেগে ওঠেনি পুরোপুরি। ভোরের কুয়াশা নদীর বুক ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়ছিল দেবীগঞ্জের ধানখেতে, আর দূরে কোথাও আজান ভেসে আসছিল বাতাসে মিশে। এই মাটিতেই জন্ম নেয় এমন কিছু মানুষ, যাদের রক্তে মিশে থাকে নদীর মতো এক অবিরাম বহমানতা। থামে না, ফেরে না, শুধু এগিয়ে চলে। রাসেল আহম্মেদ প্রধানকে দেখলে আমার বারবার সেই করতোয়ার কথাই মনে পড়ে।
তাকে আমি চিনি অনেক দিন ধরে। কাছ থেকে দেখেছি, দূর থেকেও লক্ষ করেছি। যে মানুষ কবিতা লেখেন, সেই মানুষই যখন রাস্তায় নেমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গলা তোলেন, তখন বোঝা যায় তার ভেতরে দুটো সত্তা একসাথে বাস করে। একটি কোমল, আরেকটি কঠিন। রবীন্দ্রনাথ একবার লিখেছিলেন, মানুষ বড় কে, সে প্রশ্নের উত্তর মেলে তার কাজে, কথায় নয়। রাসেলের জীবন দেখলে সেই কথাটাই বারবার সত্য মনে হয়।
দেবীগঞ্জ উপজেলার এক সুপরিচিত পরিবারে তার জন্ম। দাদা মরহুম সামসুল হক প্রধান, বাবা মরহুম আব্দুস সাত্তার প্রধান ছিলেন তৎকারলীন গ্রাম সরকার, স্থানীয় ইউপি সদস্য ও পৌর কাউন্সিলর, সততার জন্য যাদের নাম আজও মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করে। মা মরহুমা সুফিয়া বেগমের স্নেহেই বোধহয় গড়ে উঠেছিল তার ভেতরের মানবিক দিকটা। সংসারে স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার আর দুই সন্তান নিয়ে তার ছোট্ট জগৎ, অথচ কাজের পরিধি ছড়িয়ে আছে গোটা দেবীগঞ্জ জুড়ে।
শিক্ষাজীবনের পথটাও কম কৌতূহলোদ্দীপক নয়। ১৭ নং দেবীগঞ্জ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে মডেল স্কুল থেকে শুরু করে পূর্ব দেবীডুবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেবীগঞ্জ নৃপেন্দ্র নারায়ণ সরকারি হাই স্কুল, তারপর দেবীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ, শেষে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স। রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়া মানুষ যখন রাজনীতির মাঠে নামেন, তখন তার চিন্তায় থাকে তত্ত্ব আর মাটির বাস্তবতার এক আশ্চর্য মিশেল। ২০০২ সাল থেকে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু, ছাত্রদলের হাত ধরে। সদস্য থেকে সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি, সাংগঠনিক সম্পাদক, আহবায়ক, একধাপ একধাপ করে উঠে এসেছেন তিনি। আজ তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের দেবীগঞ্জ উপজেলা শাখার সদস্য সচিব এবং ৩নং দেবীগঞ্জ সদর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক।
কিন্তু রাজনীতিই তার একমাত্র পরিচয় নয়। ২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট থেকে তিনি সাংবাদিকতায়, দৈনিক যুগের আলো দিয়ে শুরু, পরে দৈনিক মানবজমিনসহ নানা পত্রিকায় লিখেছেন, এখন ঢাকা ক্যানভাসে নিয়মিত লেখেন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী পরিচয়ও তার আছে, মোটরসাইকেল পার্টসের ব্যবসা চালান দক্ষ হাতে। কবিতা লেখেন, আবৃত্তি ভালোবাসেন, স্থানীয় ম্যাগাজিনের সম্পাদনায়ও হাত পাকিয়েছেন। এত পরিচয়ের ভিড়ে একজন মানুষকে গুলিয়ে ফেলা সহজ, অথচ দেবীগঞ্জের মানুষ তাকে চেনে একটাই নামে, জনতার লোক।
দেবীগঞ্জ প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তিনি, বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক, ফ্রেন্ডস ক্লাবেরও সাধারণ সম্পাদক। কামাত পাড়া জামে মসজিদ কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ডেইরি পিজি সমিতির সভাপতি, সাহিত্য পরিষদের কোষাধ্যক্ষ, মাদকবিরোধী কমিটির সভাপতি, নদী সাংস্কৃতিক সংগঠনের সিনিয়র সহসভাপতি। এই তালিকা পড়তে পড়তে প্রশ্ন জাগে, একজন মানুষের সময় আর শক্তি কতটা হলে এতগুলো দায়িত্ব একসঙ্গে বহন করা যায়? উত্তরটা বোধহয় সময়ের হিসেবে নয়, নিষ্ঠার হিসেবে মেলে।
আমি দেবীগঞ্জের বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, আমাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে খোঁজ নিয়েছি। যা জেনেছি, তাতে একটা কথা স্পষ্ট, রাসেল আহম্মেদ প্রধানের জনপ্রিয়তা কোনো সাজানো বিজ্ঞাপন নয়, বছরের পর বছর মাটিতে কাজ করে অর্জিত আস্থা। যে তরুণ খেলার মাঠে ছুটে বেড়ায়, কবিতার খাতায় স্বপ্ন লেখে, আবার প্রয়োজনে রাস্তায় নেমে অধিকারের কথা বলে, তাকে মানুষ সহজে আপন করে নেয়।
চার্চিল একবার বলেছিলেন, সাহস মানুষের গুণাবলির মধ্যে প্রথম, কারণ সাহসই বাকি গুণগুলো টিকিয়ে রাখার জোর দেয়। রাসেলের মধ্যে সেই সাহসটা আছে বলেই তিনি অন্যায়ের সামনে চুপ থাকেন না, অথচ ব্যক্তি আক্রমণে নামেন না কখনো। এই ভারসাম্যই তাকে আলাদা করে রাখে ভিড়ের মধ্যে থেকেও।
আগামী নির্বাচনে দেবীগঞ্জ থেকে অনেকেই প্রার্থী হবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার বিশ্বাস, রাসেল আহম্মেদ প্রধান যদি সেই কাতারে দাঁড়ান, দেবীগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ তাকে আপন করেই বরণ করে নেবে। কারণ নেতা তৈরি হয় না ঘোষণায়, নেতা তৈরি হয় বছরের পর বছর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে। রাসেল সেই পথটাই হেঁটে এসেছেন, ধীরে, ধৈর্য নিয়ে, নিজের রক্তে থাকা জনসেবার তাগিদ থেকে।
করতোয়া নদী কখনো থামে না। শুধু বয়ে চলে, নতুন পলি জমায়, নতুন জীবন গড়ে। রাসেল আহম্মেদ প্রধানের কাজও যেন সেই নদীরই মতো, নীরবে, নিরন্তর। দেবীগঞ্জের মানুষ একদিন হয়তো বুঝবে, এই নদীর পাড়ে যে তরুণ হাঁটছিল নিঃশব্দে, সেই ছিল তাদের প্রকৃত মুখপাত্র।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839.