আই জামান চমক: ২০১৭ সাল। মুশফিক স্যারের একটি ফেসবুক পোস্ট চোখে পড়ল। বিষয়— ‘ধনঞ্জয়’ নামের একটি বাংলা চলচ্চিত্র। কৌতূহলবশত সেবারই মুভিটা দেখে ফেললাম। কৌশিক সেন, মিমি চক্রবর্তী, অনির্বাণ— এই তারকাদের অভিনয় মুগ্ধ করল ঠিকই, কিন্তু আমাকে বেশি আঘাত করল একটি সংলাপ। ধনঞ্জয় বলছে— “আমি গরীব। শুধু সেই কারণে আমার ফাঁসি হচ্ছে।” সেই কথাটা আজও কানে বাজে।
ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়কে অনেকেই হয়তো চেনেন না। কলকাতার ভবানীপুরের একটি আবাসিক ভবনের সামান্য নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন তিনি। ১৯৯০ সালের ৫ মার্চ সেই ভবনেই ষোলো বছরের স্কুলছাত্রী হেতাল পারেখ নিজের ফ্ল্যাটে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। হেতালের পরিবার ছিল সম্পন্ন, ছেলেমেয়ে পড়ত কলকাতার নামকরা স্কুলে। ফলে ঘটনাটি সেসময় গোটা শহরে ঝড় তুলল। মিডিয়া উত্তাল, জনমত বিক্ষুব্ধ, পুলিশের উপর চাপ অসহনীয়।
সেই চাপ সামলাতে পুলিশ সন্দেহের তির ছুড়ল ধনঞ্জয়ের দিকে। বেচারা সেদিন ছোট ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন— এটাই হয়ে উঠল পলায়নের প্রমাণ। তার মাত্র আট মাস আগে বিয়ে করা ধনঞ্জয় বুঝতেই পারলেন না, কখন জনরোষের আগুনে তিনি পরিণত হলেন অপরাধী থেকে অপরাধের প্রতীকে। মিডিয়া আর নতুন কিছু ভাবার পথে হাঁটল না। ধনঞ্জয়ই দোষী— এই সিদ্ধান্ত নিয়ে একের পর এক রিপোর্ট বের হতে থাকল। পুলিশও জনধারণার বিপরীতে যাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে সেই ধারাতেই তদন্ত রিপোর্ট দিয়ে দিল।
দীর্ঘ চৌদ্দ বছর ধনঞ্জয়ের দরিদ্র পিতা লড়েছেন। ভিটেমাটি বিক্রি করে আইনি লড়াই করেছেন। রাষ্ট্রপতির দরজায় প্রাণভিক্ষার আবেদন নিয়ে গেছেন। সব ব্যর্থ হয়েছে। ২০০৪ সালের ১৫ আগস্ট আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ধনঞ্জয়কে ফাঁসিতে ঝোলানো হলো।
এরপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপক— পরমেশ গোস্বামী, দেবাশীষ সেনগুপ্ত এবং প্রবাল চৌধুরী— মামলাটি নিয়ে গবেষণায় বসলেন। তাঁদের বই ‘আদালত, মিডিয়া, সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি’ সামনে আনল ভয়ংকর সত্য। পুরো বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছিল জনতুষ্টিবাদের চাপে। পরিস্থিতিগত সাক্ষ্যের উপর দাঁড়িয়ে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ফাঁকফোকর আড়াল করে একজন নিরীহ মানুষকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।
প্রকৃত সত্য আরও মর্মান্তিক। হেতালের সঙ্গে তার বয়ফ্রেন্ডের শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল— এটা জানতে পেরে হেতালের মা ক্রোধে অন্ধ হয়ে মেয়েকে মারধর করেন। সেই মারধরেই দুর্ঘটনাক্রমে মৃত্যু হয় হেতালের। এরপর নিজেকে বাঁচাতে তিনি পরিকল্পিতভাবে দায় চাপিয়ে দেন নিরীহ ধনঞ্জয়ের উপর। কিন্তু যখন এই সত্য প্রমাণিত হলো— ততদিনে ধনঞ্জয়ের ফাঁসি হয়ে গেছে।
এই মর্মান্তিক ইতিহাস আজ সামনে আনছি একটি বিশেষ কারণে। বাংলাদেশে এখন ধর্ষণ ও শিশু ধর্ষণের খবর উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মানুষ ক্ষুব্ধ, মানুষ ব্যথিত— সেটা স্বাভাবিক এবং সঙ্গত। আবেগের জায়গা থেকে মানুষ সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড চাইছে, এটাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমি গণপিটুনি দিয়ে হত্যার পক্ষে নই। কারণ সেটাও আইনের লঙ্ঘন। যে আইন রক্ষার কথা বলছি, সেই আইনকেই পদদলিত করে বিচার হয় না।
দশ-পনেরো দিনে ফাঁসির দাবি শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু তা বাস্তবে বিপজ্জনক। তাড়াহুড়ার বিচারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন ধনঞ্জয়ের মতো দরিদ্র, অসহায় মানুষেরা— যাদের পক্ষে সরব হওয়ার মতো টাকা নেই, মিডিয়া নেই, ক্ষমতা নেই। আইনকে তার নিজস্ব গতিতে প্রবাহিত হতে দিতে হবে। তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষভাবে, বিচার হতে হবে সাক্ষ্যের ভিত্তিতে— জনরোষের ভিত্তিতে নয়।
আমি চাই আইনের পরিপূর্ণ প্রয়োগ। দ্রুত নয়— সঠিক।
ধনঞ্জয়ের সেই সংলাপটা আজও প্রাসঙ্গিক। গরীব বলেই কি ফাঁসি? এই প্রশ্নের উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের বিচারব্যবস্থাকে আবেগের চাপ থেকে মুক্ত রেখে ন্যায়ের পথে হাঁটতে হবে। প্রতিটি মামলার প্রতিটি সাক্ষ্য যাচাই করতে হবে। কারণ একজন নির্দোষ মানুষের ফাঁসি— সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরাজয়।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839