আই জামান চমক, icrbd24: বুড়ি তিস্তার জল যেখানে বাঁক নিয়ে দেবীগঞ্জের বুক চিরে বয়ে যায়, সেখানেই টেপ্রীগঞ্জের বটতলী গ্রাম। ভাদ্রের ভরা নদী কিংবা চৈত্রের শুকনো চর, ঋতু বদলায়, কিন্তু এই মাটির মানুষগুলোর একটা চরিত্র বদলায় না। তারা প্রতিবাদী। তারা অভিমানী। আর তারা ভালোবাসতে জানে সীমাহীন। এমনই এক মাটির সন্তান মজিবুল হোসেন। যাকে চেনেন সবাই মধু নামে।
পঁচাশি সালের পাঁচই জুলাই সায়েদ আলীর ঘরে জন্ম নেওয়া ছেলেটির নাম রাখা হয়েছিল মজিবুল হোসেন। কিন্তু নাম যা-ই হোক, ডাক নামটাই টিকে গেল আজীবনের মতো। কথায় মিষ্টতা, ব্যবহারে মধুর মতো নরম, তাই বাবা মা ভাই বোন পাড়া প্রতিবেশী সবাই ডাকতে লাগলেন মধু বলে। ছোট একটা নাম। অথচ তার ভেতরে জমে থাকা মানুষটা কতটা বড়, সেটা বোঝা গেল অনেক পরে, যখন রাজপথে জীবন বাজি রাখার সময় এল।
আমি অনেক মানুষ দেখেছি জীবনে। কেউ কথায় বড়, কাজে ছোট। কেউ আবার উল্টো। মধুকে যতটুকু জেনেছি, তার কথা আর কাজের মধ্যে কোনো ফাঁক নেই। অন্যের কষ্টে বুক কাঁপে তার, এই কথাটা শোনাতে সহজ, কিন্তু বাস্তবে প্রমাণ করা কঠিন। চব্বিশের জুলাইয়ে যখন গোটা দেশ উত্তাল, তখন অনেকেই ঘরে বসে খবর দেখেছেন, আলোচনা করেছেন, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। মধু নামলেন রাস্তায়। জুলাইয়ের চব্বিশ তারিখে রাজপথ থেকে আটক হলেন তিনি। সেই দিনগুলো কেমন ছিল, যারা দেখেছেন তারাই জানেন। এক অনিশ্চয়তার অন্ধকার, যেখানে পরদিন সকাল দেখা যাবে কি না তারও নিশ্চয়তা নেই। পাঁচই আগস্ট সরকার পতনের পর ছয় তারিখে কারাগারের দরজা খুলল। মুক্ত বাতাসে প্রথম নিঃশ্বাস নিলেন মধু। কিন্তু সেই মুক্তি একা তার ছিল না, একটা প্রজন্মের স্বপ্নের মুক্তি ছিল সেটা।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, বিপদকে না বলিয়া বিপদের মুখে দাঁড়াইতে চাই। মধুর জীবনটা যেন সেই একটি লাইনের বাস্তব রূপ। কৈশোর থেকেই তিনি একটা সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন। স্বপ্ন দেখা সহজ, কিন্তু সেই স্বপ্নের জন্য পথে নামা কঠিন। ২০০৮ সালে শহীদ জিয়ার আদর্শকে বুকে ধারণ করে তিনি যুক্ত হলেন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে। টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির রাজনীতিতে সরাসরি নাম লেখালেন সেই বছরই। এরপর সময় গড়িয়েছে। ২০১১ সালে সাত নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সদস্য নির্বাচিত হলেন। ছোট্ট একটা পদ, কিন্তু রাজনীতির প্রথম সিঁড়িতে পা রাখা মানুষটার জন্য সেটাই ছিল বড় দায়িত্বের শুরু।
সময় বদলেছে, নেতা বদলেছে, কিন্তু মধুর অবস্থান বদলায়নি। ২০২৫ সালে টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক হিসেবে নির্বাচিত হলেন তিনি। প্রায় দেড় যুগ ধরে একটা মানুষ যদি একই আদর্শের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, ঝড়ে পড়ে না, লোভে পড়ে না, তাহলে সেই মানুষকে অবিশ্বাস করার কোনো কারণ থাকে না। রাজনীতিতে আজকাল আনুগত্য বদলানোর হিড়িক দেখি চারপাশে। সকালে এক দল, বিকেলে আরেক দল। এই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে খুঁজে পাওয়াই এখন দুষ্কর হয়ে গেছে।
আমার নিজের প্রশ্ন জাগে মাঝে মাঝে। রাজনীতি কি শুধু ক্ষমতার সিঁড়ি, নাকি এখনো কারো কারো কাছে সেবার আরেক নাম? মধুর মতো মানুষদের দেখলে মনে হয়, উত্তরটা এখনো একেবারে হারিয়ে যায়নি। অন্যায়ের প্রতিবাদে যে মানুষ পিছপা হয় না, জেলের ঘানি টানতেও যার ভয় নেই, তাকে শুধু একজন কর্মী বলে ফেললে ভুল হবে। তিনি একজন সাক্ষী। সময়ের সাক্ষী, সাহসের সাক্ষী।
চার্চিল একবার বলেছিলেন, সাহস হলো এমন একটি গুণ যা অন্য সব গুণকে ধরে রাখে। মধুর জীবনের দিকে তাকালে কথাটা মিথ্যা মনে হয় না। মিষ্টি স্বভাবের আড়ালে যে মানুষটা লুকিয়ে থাকে, সে যখন রাজপথে দাঁড়ায়, তখন সেই মিষ্টতা রূপ নেয় দৃঢ়তায়। বটতলীর মাটি তাকে জন্ম দিয়েছে, বুড়ি তিস্তার জল তাকে বড় করেছে, আর সময় তাকে পরীক্ষা নিয়েছে বারবার। প্রতিবার সে পাস করেছে।
দেবীগঞ্জের মাটিতে এমন অনেক মধু ছড়িয়ে আছে, যাদের নাম কখনো পত্রিকার শিরোনাম হয় না। তবু তারাই সমাজের ভিত গড়ে দেয়। আজ যখন লিখছি এই কথাগুলো, তখন মনে পড়ছে ছোটবেলায় শোনা একটা প্রবাদ, সোনা যেমন আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়, মানুষও তেমনি পরীক্ষায় পুড়ে চেনা যায়। মধু সেই পরীক্ষায় পুড়েছেন, আর প্রতিবার আরও খাঁটি হয়ে বেরিয়ে এসেছেন।
পাঠক, প্রশ্ন রেখে যাই আপনাদের কাছে। আপনার আশেপাশে কি এমন কোনো মধু আছে? যার নাম কখনো আলোচনায় আসে না, অথচ যে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে ন্যায়ের পাশে? তাকে খুঁজে বের করুন। তার গল্প বলুন। কারণ এই মধুরা বেঁচে থাকলেই সমাজের তিতকুটে দিনগুলোতেও একটু মিষ্টতা টিকে থাকে।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839.