পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের নিরিবিলি জলাপাড়া গ্রামে গড়ে ওঠা ‘ঢাকা আহছানিয়া মিশন শিশু নগরী’র আকাশ ছেঁয়ে আজ আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের রঙিন রঙ। জীবনের শুরুতেই নানা প্রতিকূলতা আর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া শিশুরা আজ তাদের স্বপ্নের নতুন এক শিখরে পৌঁছেছে। সুবিধাবঞ্চিত, অনাথ ও ছিন্নমূল পথশিশুদের মানবিক আশ্রয়ের মধ্য দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার এই আশ্রয়নীড়ে লেগেছে অনন্য সাফল্যের ছোঁয়া। চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট বা এসএসসি পরীক্ষায় পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে এই প্রতিষ্ঠানের ১০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো, তাদের মধ্য থেকে ৯ জন শিক্ষার্থী সফলতার সঙ্গে পাস করেছে।
জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে আলোর ধারায় ফিরে আসা এই অদম্য উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা হলো নিরব ইসলাম, জুয়েল হাওলাদার, মেহেদি হাসান, আনিছুর ইসলাম, আলিউল ইসলাম, সাকিব হাওলাদার, সুমন মিয়া, আল-আমিন এবং সাকিব। শৈশবের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আজকের এই অর্জন কেবল তাদের এক একটি ভালো ফলাফল নয়, বরং এটি তাদের জীবন পরিবর্তনের এক নতুন প্রত্যয়।
২০১২ সালে যাত্রা শুরু করার পর থেকে অত্যন্ত মানবিক ও মমতাভরা পরিবেশে এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে আসছে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরী। সেখানে প্রায় ১৬০ জন শিশুর দৈনন্দিন জীবনযাপন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সার্বিক দায়িত্ব পালন করা হয়। শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার ব্যাপারে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে আসছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে বিগত বছরগুলোতেও।
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সেন্টার ম্যানেজার দীপক কুমার রায় জানান, গত পাঁচ বছরে এই কেন্দ্র থেকে ৪৮ জন শিশু এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫-সহ অত্যন্ত মনপুত ও আশাব্যঞ্জক ফলাফল অর্জন করেছে। তিনি বলেন, এখানে অবস্থানরত শিশুদের শুধু সাধারণ শিক্ষাই দেওয়া হয় না, পাশাপাশি কারিগরি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করে তাদেরকে দক্ষ ও স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। পড়াশোনার গুণগত মান বজায় রাখার জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করা হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তাদের অতীত ও বর্তমানের মানসিক ধাক্কা সামলে তুলে ধরা হয় সুন্দর ভবিষ্যতের আলো। অতীত ভুলে সুন্দর আগামী গড়তে তাদের মনে প্রবল মনোবল সৃষ্টি করা হয় এবং মানসিকভাবে তাদের তৈরি করা হয় সমাজের মূলধারায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার জন্য।
প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যবস্থা ও আর্থিক দিক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানা যায়, শুরুর দিকে অর্থাৎ ২০২১ সাল পর্যন্ত একটি দাতা সংস্থার মানবিক সহায়তায় এই অনন্য প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে বর্তমানে কোনো আন্তর্জাতিক বা বাহ্যিক সহায়তা ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে অনাথ ও ছিন্নমূল এসব শিশুর যত্ন, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের ভার বহন করছে ঢাকা আহছানিয়া মিশন।
প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের মতে, এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পুরোপুরি অন্ধকার থেকে বের করে এনে সমাজের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করতে এবং দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে, তা একা একটি সংস্থার পক্ষে দীর্ঘদিন চালানো কঠিন। এসব শিশুর স্বপ্নগুলোকে সত্যি করতে এবং তাদের সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ, প্রবাসী ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে মুক্তহস্তে সহায়তার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। সঠিক সহযোগিতা ও সহানুভূতি পেলে এসব অনাথ ও ছিন্নমূল শিশুই একদিন দেশের জন্য বড় সম্পদ হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা।