রংপুরের গঙ্গাচড়ায় মাদক, বাল্যবিবাহ, মোবাইল ফোনভিত্তিক অপরাধ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে পরিবার ও সমাজকে আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গঙ্গাচড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুস সবুর জুমার নামাজের পর উপজেলার বেতগাড়ী ইউনিয়নের বটতলা জামে মসজিদে উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বিশেষ সচেতনতামূলক বক্তব্যে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে সামাজিক নানা ব্যাধি ও অপরাধের বিস্তার ঠেকাতে প্রতিটি পরিবারকেই প্রথম ও প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে এবং তাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড কেমন, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখা জরুরি। সন্তানদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের দূরত্বের কারণেই মূলত তরুণ সমাজ নানা ভুল পথে পা বাড়ায়। তাই তাদের সঙ্গে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনার পরিবেশ তৈরি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মাদক কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির জীবনই ধ্বংস করে না, বরং পুরো পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থার ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বক্তব্যে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিলে তাদের স্বাভাবিক বিকাশ, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ জীবন ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। কোনো পরিবার যেন কোনোভাবেই বাল্যবিবাহের আয়োজন না করে, সে বিষয়ে অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে। কোথাও এমন আয়োজনের খবর পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রতিরোধে সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। বর্তমান সময়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ ও গতিশীল করলেও এর অপব্যবহার থেকে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সৃষ্টি হচ্ছে। কিশোর-কিশোরীরা যাতে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে কোনো ধরনের প্রতারণা, হয়রানি, সাইবার অপরাধ বা অন্য কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য তাদের অনলাইন কার্যক্রমের ওপর নজর রাখা পরিবারের দায়িত্ব।
বর্তমান সময়ে বেড়ে যাওয়া আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে পরিবারের মানসিক সহযোগিতার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। হতাশা বা মানসিক সংকটে থাকা কোনো ব্যক্তির আচার-আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধরে সেই ব্যক্তির কথা শোনা, সার্বক্ষণিক পাশে থাকা এবং ক্ষেত্রবিশেষে দ্রুত পেশাদার পরামর্শ বা সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একটি সহমর্মী ও সহানুভূতিশীল পরিবারই পারে কোনো মানুষকে এমন কঠিন ও চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে ফিরিয়ে আনতে। পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুস সবুর স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন যে, কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে এককভাবে মাদক, বাল্যবিবাহ, সাইবার অপরাধ কিংবা আত্মহত্যার প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সামাজিক এসব ব্যাধি মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি এবং তরুণ সমাজসহ পুরো সম্প্রদায়কে সমন্বিতভাবে একসঙ্গে কাজ করে যেতে হবে। অভিভাবকদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান যেন তারা নিজেদের সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেন, তাদের মনের কথা গুরুত্বের সঙ্গে শোনেন এবং ছোটবেলা থেকেই নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধে গড়ে তোলেন। জুমার পর আয়োজিত এই সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে মসজিদের মুসল্লি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।