আই জামান চমক, icrbd24: সারাদিন বসে রইলাম। কী লিখব, কীভাবে লিখব — ভাবতে ভাবতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। কলমটা হাতে নিলাম, রাখলাম। আবার নিলাম। এভাবে কতবার যে তুলে রেখেছি, হিসেব নেই। কাছের মানুষকে নিয়ে লিখতে গেলে এই সমস্যাটা হয় — অনেক কিছু বলার থাকে, তবু ঠিক কোথা থেকে শুরু করব বুঝে উঠতে পারি না। যাঁকে ভালোবাসা যায়, তাঁকে নিয়ে কথা বলা কঠিন। ভালোবাসার কথা সহজে গলা দিয়ে বেরোয় না।
আজ ১৯ এপ্রিল। সুমন পালিতের জন্মদিন।
১৯৫৪ সালের এই দিনে খুলনায় জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। সেই মাটির সন্তান আজ সাত দশকেরও বেশি পথ পেরিয়ে এসেছেন। এই দীর্ঘ পথে কতটা কাঁটা ছিল, কতটা ধুলো ছিল — বাইরে থেকে সেসব পুরোপুরি বোঝার উপায় নেই। কিন্তু একটা জিনিস বোঝা যায় তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে। যে মানুষ সত্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে বুকের মধ্যে একটা জ্বলন ধরিয়ে রাখেন, তাঁর কলম থেকে আগুনের গন্ধ আসে।
সুমন পালিতের লেখা আমি পড়ছি অনেক বছর ধরে। ঠিক কবে থেকে, তারিখ দিতে পারব না। তবে মনে আছে, একটা লেখার শিরোনাম পড়েই থমকে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল — এই মানুষ লেখেন কীভাবে? শিরোনামেই যদি পাঠককে এভাবে টেনে ধরা যায়, ভেতরে কী আছে? তারপর প্রথম লাইন পড়লাম। দ্বিতীয় লাইন না পড়ে পারলাম না। এভাবে শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছালাম। পত্রিকার পাতা ভাঁজ করে রেখে দিলাম, যেন সেটা আর ফেলে দেওয়া না যায়।
সুমন পালিতের লেখা মানে অমৃত।
কথাটা বড় মুখের মতো শোনাচ্ছে হয়তো। কিন্তু যাঁরা তাঁর লেখা পড়েছেন, তাঁরা জানেন — এর ভেতর অতিরঞ্জন নেই। বাংলাদেশ প্রতিদিনের পাতায় যখন তাঁর কলাম ছাপা হয়, অনেকেই সেটা আগে পড়েন। কারণ একটাই — তাঁর কলমে সত্য আসে সাহস নিয়ে, ভাষা আসে প্রাণ নিয়ে।
আমার নিজের কথা বলতে লজ্জা লাগে না। টুকটাক যা লিখি — কলাম, নিবন্ধ — তার অনেকটা জুড়েই সুমন পালিতের একটা ছায়া আছে। অদৃশ্য, কিন্তু আছে। লেখার ধরন শেখা হয়েছে তাঁকে দেখে। কীভাবে শুরু করতে হয়, কীভাবে পাঠককে টানতে হয়, কীভাবে একটা সত্যকে গল্পের ভেতর দিয়ে বলতে হয় — এসব তাঁর কাছ থেকেই নেওয়া। তিনি জানেন না। আমি কোনো দিন বলিনি। আজ বলছি।
তাঁর লেখা আমার পরম স্বজন। হয়তো তার চেয়েও বেশি কিছু। কারণ স্বজন মাঝে মাঝে বোঝে না, কিন্তু একজন প্রিয় লেখকের কলম সবসময় বোঝে। প্রতিটি বাক্যে যেন একজন বন্ধু বলছেন — হ্যাঁ, তুমি ঠিকই ভাবছ।
রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন, সাহিত্যের কাজ হলো মানুষের একাকীত্বকে কম করা। সুমন পালিতের লেখা আমার সেই একাকীত্বকে বহুবার কমিয়েছে। যখন মনে হয়েছে, লেখা দিয়ে কী হয়, কেউ পড়ে না, কেউ বোঝে না — তখন তাঁর কোনো একটা কলাম পড়েছি। মনে হয়েছে, না, এই পথে হাঁটতে হবে। ক্লান্ত হলেও।
আজ দিনটা শেষ হয়ে আসছে। সারাদিন ভেবেছি, কী লিখব তাঁকে নিয়ে। শেষে মনে হলো — বড় কিছু লেখার দরকার নেই। শুধু এটুকু বলি: আপনি যে লিখেছেন, সেই লেখা বৃথা যায়নি। অন্তত একজন মানুষের কলমকে জাগিয়ে রাখার কাজটা করেছে আপনার লেখা। সেই মানুষটা আমি।
শুভ জন্মদিন, সুমন পালিত। দীর্ঘায়ু হোন। কলম যেন না থামে।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839