আই জামান চমক, icrbd24: করতোয়ার জল কখনো থামে না। পাথর পড়ুক, কাদা পড়ুক — নদী তার পথ চেনে। সাংবাদিকতাও অনেকটা সেরকম। যতই বাধা আসুক, যতই কাদা ছোঁড়া হোক — যে কলম সত্যের পক্ষে একবার উঠেছে, সে কলম সহজে মাথা নোয়ায় না।
হরিশ রায়কে আমি সরাসরি চিনি না। কখনো মুখোমুখি বসিনি, কোনো চায়ের কাপ ভাগ করিনি। কিন্তু ফেসবুকের পাতায়, সহকর্মীদের মুখে মুখে যে মানুষটির নাম বারবার ফিরে এসেছে — সে নামের পাশে সবসময় একটাই বিশেষণ এঁটে থেকেছে। সৎ।
দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি। বাপার সভাপতি। ঐক্য পরিষদের সেক্রেটারি। সীতানাথ মহাক্ষেত্র ধামের সম্পাদক। গৌড়ীয় মঠের সম্পাদক। ক্ষত্রিয় সমিতির জেলা সেক্রেটারি। জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের জেলা সেক্রেটারি। দৈনিক সমকাল ও অর্থনীতি পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি। একজন মানুষ এতগুলো দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে হাঁটছেন — এবং হাঁটছেন মাথা উঁচু করে। এই পথ কখনো ফুলবিছানো ছিল না, আজও নেই।
তারপর একদিন হরিশ দাদা একটি মত প্রকাশ করলেন। পঞ্চগড়ের জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধান সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকে হরিশ দাদা একটি প্রতিক্রিয়া জানালেন। এটুকুই। এটুকুর জন্য “এপিঠ আর ওপিঠ” নামের ফেসবুক আইডিসহ বেশ কিছু আইডি থেকে শুরু হলো তাঁর বিরুদ্ধে সংগঠিত অপপ্রচার।
অভিযোগগুলো পড়লে গা শিউরে ওঠে। মন্দিরের অর্থ আত্মসাৎ। পুলিশ কর্মকর্তার প্রভাব খাটিয়ে ফায়দা লোটা। নব্য বিএনপি। একের পর এক কাদার বল ছোঁড়া হলো। হরিশ দাদা নিজেই উত্তর দিয়েছেন শান্ত কণ্ঠে — মন্দিরের উন্নয়নে লক্ষ লক্ষ টাকা নিজে খরচ করেছেন, সেখান থেকে নেননি। তৎকালীন ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্যের সাথে সম্পর্ক ছিল স্নেহের, সেই সম্পর্ক ব্যবহার হয়েছে নির্যাতিত মানুষের জন্য, নিজের পকেটের জন্য নয়। আর দলবদলের অভিযোগ? তিনি এখনো কোনো দলে যোগ দেননি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো — এই অভিযোগগুলো কি সত্যিই অভিযোগ? নাকি এগুলো আসলে অস্ত্র? যখন কাউকে যুক্তি দিয়ে থামানো যায় না, তখন চরিত্র দিয়ে থামানোর চেষ্টা করা হয়। এটা নতুন কৌশল নয়। যুগে যুগে সৎ মানুষের বিরুদ্ধে এই পথেই হাঁটা হয়েছে।
হরিশ দাদা নিজেই লিখেছেন — তাঁর অপরাধ হলো, গত নির্বাচনে তিনি সনাতনীদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন, স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এটুকুই যথেষ্ট। এই সত্যটুকু স্বীকার করে নেওয়ার সাহস অভিযোগকারীদের নেই, তাই কাদার আশ্রয়।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সত্যের জন্য সব কিছু দেওয়া যায়, কিন্তু সত্যকে কিছু দেওয়া যায় না। সাংবাদিকতা এই সত্যের পথেই হাঁটে। হরিশ দাদা নিজেও স্পষ্ট বলেছেন — কারো অনুগ্রহে নয়, নিজের বিবেক ও দায়িত্ববোধ থেকে তিনি লেখেন। কার পক্ষে বা বিপক্ষে লিখবেন, সেটি সম্পূর্ণ তাঁর নিজের বিষয়। এই কথাটুকু পড়ে আমার বুকের ভেতর কী একটা নড়ে উঠল। কারণ এই কথাটা শুধু হরিশ রায়ের কথা নয়। এই কথাটা আমাদের সবার কথা, যারা এই পেশায় এসেছি চোখ খোলা রেখে।
এবার একটু অন্যরকম কিছু দেখলাম। হরিশ দাদার পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকে। সামাজিক সংগঠনের মানুষ, সুশীল সমাজ, সহকর্মী সাংবাদিকরা — প্রতিবাদ জানিয়েছেন একে একে। এক রাজনৈতিক নেতা লিখেছেন, তাঁর সুনামের কাজে ঈর্ষান্বিত হয়েই একটি মহল এই অপপ্রচারে নেমেছে। কথাটা মিথ্যা নয়। যার কোনো অর্জন নেই, তাকে নিয়ে কেউ ষড়যন্ত্র করে না। ষড়যন্ত্র হয় তাদের বিরুদ্ধেই, যারা সত্যিকার অর্থে কিছু একটা করে ফেলেছেন।
যারা “এপিঠ আর ওপিঠ” নামের আড়ালে এই অপকর্ম করছেন, তাদের কাছে একটাই কথা — সাহস থাকলে পরিচয় দিয়ে কথা বলুন। প্রমাণ থাকলে সামনে আনুন। আইন আছে, আদালত আছে। সেই পথে যান। ছদ্মনামের আড়ালে থেকে একজন পরিশ্রমী মানুষের জীবনের গায়ে কালি লেপে দেওয়ার এই কাজ — এই কাজ সমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, একটু ভাবুন। আজ হরিশ রায়, কাল হয়তো অন্য কেউ। পরশু হয়তো আপনি নিজেই।
হুমকি ধামকি এ পেশার নিত্যসাথী — এটা জেনেই আমরা কলম হাতে নিয়েছি। হরিশ রায়ের মতো সাংবাদিকেরা যুগে যুগে এসেছেন, সত্য বলেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন — আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, আবার বলেছেন। অপশক্তির রক্তচক্ষু যুগে যুগে হেরে গেছে।
করতোয়ার জল থামে না। সত্যও থামে না। আর এই কলমও থামবে না।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839