আই জামান চমক: যমুনা নদী সব কিছু নিয়ে যায়। ঘর নেয়, ভিটে নেয়, কখনো কখনো স্বপ্নও নেয়। কিন্তু মানুষকে সে নিতে পারে না। মানুষ থেকে যায়। থেকে যায় তার গল্প, তার লড়াই, তার নাম। ভূঞাপুরের মানুষ এটা জানে। লৌহজংয়ের কূলের মানুষ এটা বোঝে। কারণ তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেখেছে — চর জাগে, চর ডোবে, কিন্তু মাটির মানুষ টিকে থাকে।
সেলু স্যারের কথা যখন ভাবি, তখন এই নদীর কথাই মনে আসে।
অনেক বছর আগের কথা। তখন আমার নিজের জীবনে ঝড় চলছে। যে পত্রিকায় কাজ করতাম, সেটি তৎকালীন এমপি আর এক মন্ত্রীর রোষানলে পড়ে বন্ধ হয়ে গেল। প্রেস বন্ধ, পুলিশ দরজায়, নামে মামলা। সাংবাদিকতা করতে এসে এই পরিণতি — তখন যারা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের কথা আমি আজও বুকে রাখি। সোহেল তালুকদার, সারোয়ার সাদী রাজু ভাই — এমএসডি ফাউন্ডেশনের ছাদে কত সন্ধ্যা কেটেছে, কত কাজের উছিলায় সহায় হয়েছেন তাঁরা।
ঠিক সেই সময়টায় একদিন সিটিসেল ফোনে একটা কল এলো। ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ — সেলু স্যার। বললেন, “ব্যস্ততা কমলে আইসো। কথা বলব। সন্ধার পর প্রেসে থাকব।”
এটুকুই। কিন্তু এই এটুকুর ভার কত ভারী, সেটা যে বিপদে পড়েনি, সে বুঝবে না।
সেলিমুজ্জামান তালুকদার সেলু স্যারকে আমি যতটুকু কাছ থেকে দেখেছি, ততটুকু বলতে পারি — তাঁর মধ্যে একটা স্থিরতা আছে। ঝড়ের মধ্যেও যে মানুষ ঘাবড়ায় না, সে রকম স্থিরতা। তাঁর মুচকি হাসিটার কথা আলাদা করে বলতে হয়। সেই হাসিতে না আছে অহংকার, না আছে ভান। আছে একটা শান্ত আশ্বাস — যেন বলছেন, সব ঠিক হবে।
বিএনপির সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতে সেলু স্যার রাজপথ ছাড়েননি। দলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যুক্ত, শহীদ জিয়ার আদর্শ বুকে ধরে চলা এই মানুষটি ফলদা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে যা করেছেন, তা ভূঞাপুরের মানুষ দেখেছে। তারা মনে রেখেছে।
সম্প্রতি স্থানীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সামনে তিনি ঘোষণা দিলেন — ভূঞাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। বললেন জীবনের বাকি সময়টুকু ভূঞাপুরের মানুষের সেবায় উৎসর্গ করতে চান।
কথাটা শুনে আমার মনে পড়ল সেই পুরনো ফোন কলের কথা। তখনো তিনি বলেছিলেন মানুষের কথা। নিজের কথা নয়।
যমুনার পাড়ের মানুষেরা সহজে কাউকে বিশ্বাস করে না। বিশ্বাস করলে পুরোটা করে। সেলু স্যার সেই বিশ্বাস অর্জন করেছেন দীর্ঘ পথ হেঁটে। শিক্ষক হিসেবে মাথা উঁচু রেখে, নেতা হিসেবে মানুষের দুয়ারে গিয়ে।
এখন প্রশ্ন হলো — ভূঞাপুরের মানুষ কি এই মুহূর্তে এমন একজন মানুষ চায়, যিনি ঝড়ের দিনে পাশে ছিলেন? নাকি তারা এখন অন্য কিছু খুঁজছে?
আমার বিশ্বাস, যমুনার ঢেউ যা ভাসায় না, তা ভূঞাপুরের মানুষের স্মৃতিও ভাসায় না। সেলু স্যার নামটা শুধু একজন মানুষের নাম নয়। এটা এই এলাকার সংগ্রামী মানুষগুলোর সমষ্টিগত পরিচয়। একটা নদীর মতো — যে ভাঙে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগিয়েই যায়।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839।