আই জামান চমক: শুক্রবার সকালে যশোরের মাঠে কুয়াশা থাকে না এই সময়টায়। রোদ ওঠে তাড়াতাড়ি, মাটি শুকিয়ে ফাটল ধরে, আর খালের বুকে জল থাকলে তাতে আকাশের ছায়া পড়ে। না থাকলে শুধু থাকে ধুলো আর শেওলা ধরা পাড়।
জিয়া খালের কথা শার্শার মানুষ জানে বহু বছর ধরে। উলাশী ইউনিয়নের কৃষক জানে এই খাল কতটুকু বাঁচায়, আর কতটুকু ভোগায়। বর্ষায় জল ধরে রাখতে পারে না, শুকনোয় দেয় না এক ফোঁটা। মাঝখানে মানুষ। ৯৯ একর জমির ফসল প্রতি বছর ডুবে যায়, নয়তো শুকিয়ে মরে। ১৮ হাজার পাঁচশো কৃষকের মুখ চেয়ে থাকে আকাশের দিকে। রাষ্ট্র তখন কোথায় থাকে? সেটাই তো প্রশ্ন।
সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সংখ্যায় মেলে না। মেলে সরেজমিনে।
১৭ই এপ্রিল, শুক্রবার, সকাল এগারোটায় প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এমপি পা রাখলেন সেই খালের পাড়ে। শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। অন্য অনেকে তখন বিশ্রামে, ঘরে, দূরে। তিনি এলেন মাঠে। কর্মকর্তাদের নিয়ে দাঁড়ালেন খালের ধারে। দেখলেন। শুনলেন। দিকনির্দেশনা দিলেন।
এটুকু শুনলে সাধারণ মনে হয়। কিন্তু এটুকুই অসাধারণ, যখন না-করার সংস্কৃতিটাই অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।
তিনি বললেন, খাল পুনঃখনন হবে। পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হবে। দুই পাড়ে গাছ লাগানো হবে, আড়াই হাজার গাছ। মৎস্য চাষ হবে, হাঁস পালন হবে, মানুষের কাজ হবে। একশো জন শ্রমিক ষাট দিন কাজ পাবে। শুষ্ক মৌসুমে সতেরোশো ত্রিশ একর জমিতে সেচ মিলবে। বর্ষায় পানি সরবে পঁয়ত্রিশ বর্গকিলোমিটার এলাকা থেকে।
সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়। এগুলো মানুষের জীবন। বাহাত্তর হাজার মানুষের জীবন যারা পরোক্ষভাবে বদলে যাবে একটি খাল সচল হলে। একটি খাল। ভাবা যায়?
বাংলাদেশে নেতা হওয়া সহজ। ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দেওয়া আরও সহজ। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে খালের পাড়ে দাঁড়ানো? ছুটির দিনে? এটা সহজ নয়। এটা স্বভাব।
ফরহাদ হোসেন আজাদকে কাছ থেকে যারা দেখেছেন, তারা জানেন এই মানুষটি চুপ থাকতে পারেন না কাজ ছাড়া। বিলাস তাঁকে টানে না। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ফিতে কাটাতে যতটুকু আগ্রহ, মাঠে নামতে তার চেয়ে বেশি। করতোয়া বা তিস্তার স্রোতের মতোই তিনি চলেন, থামেন না, সরিয়ে যান বাধা।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, কর্মই ধর্ম। কথাটা এখন পুরনো শোনায়, কারণ কর্মহীনতাকে আমরা স্বাভাবিক ভেবে নিয়েছি। কিন্তু যখন কেউ সত্যিই কাজ করেন, পুরনো সত্যটা আবার নতুন হয়ে ওঠে।
একটি খাল বাঁচলে বাঁচে ফসল। ফসল বাঁচলে বাঁচে কৃষক। কৃষক বাঁচলে বাঁচে দেশ। এই সরল সমীকরণটা বোঝার জন্য বড় পদ লাগে না, বড় মন লাগে।
উলাশীর মাঠে জিয়া খালের পাড়ে সেদিন একজন মানুষ দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর পরিচয় তাঁর পদে নয়, তাঁর পদক্ষেপে।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839।