জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন করতে চরম নির্যাতন, প্রকাশ্যে গুলি বর্ষণ এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের স্ত্রীর ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে, সেই বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা সাইফুল আলম এখন ঢাকা জেলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাভার মডেল থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মেহেরপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর হত্যাচেষ্টা, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং শতকোটি টাকার অনলাইন জুয়া বাণিজ্যের মূল কারিগর হয়েও এই কর্মকর্তা কীভাবে বহাল তবিয়তে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভে ফুঁসছে মেহেরপুরের সুশীল সমাজ, স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত এবং সাধারণ ছাত্র-জনতা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২২ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দায়িত্ব পালন করেন সাইফুল আলম। ওই সময়কালে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া একদম নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, গুলি বর্ষণ এবং স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের স্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ অধিদপ্তরে দুটি লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে, যার স্মারক নম্বর ৪১৯ এবং তারিখ ৪ আগস্ট ২০২৬। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর মেহেরপুরের মুজিবনগর থানা থেকে গভীর রাতে আত্মগোপনে চলে যান সাইফুল আলম। এর আগে ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের সময় তিনি শরীয়তপুর জেলা ডিবি এবং তার পূর্বে কিশোরগঞ্জ ডিবিতে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া আওয়ামী শাসন আমলে বাগেরহাটের মোল্লারহাটে শ্বশুরবাড়ির সুবাদে শেখ হেলালের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে মেহেরপুর জেলা ডিবিতে তিনি নিজস্ব একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মেহেরপুরের সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও তাঁর পরিবারের গড়ে তোলা দুর্নীতি সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিলেন এই পুলিশ পরিদর্শক সাইফুল আলম। স্থানীয়দের কাছে তিনি মূলত পরিচিত ছিলেন মন্ত্রীর স্ত্রী মোনালিসা ইসলামের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে। মন্ত্রীর স্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকা মেহেরপুরের শতকোটি টাকার অনলাইন জুয়া ব্যবসার মূল তদারক ও অর্থ সংগ্রহের গুরুদায়িত্বে ছিলেন সাইফুল আলম নিজেই। এই খাত থেকে প্রতি মাসে আনুমানিক ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা কালেকশন করা হতো। পাশাপাশি সাবেক মেহেরপুর পৌরসভার মেয়র ও জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান রিটনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ডিবি পুলিশ মেহেরপুর থেকে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। মন্ত্রীর আত্মীয়স্বজনদের অবৈধ সিন্ডিকেটে কেউ সামান্যতম বাধা দিলে ওসি সাইফুল আলমকে দিয়ে তাঁকে গ্রেফতার ও চরম হয়রানি করা হতো।
অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন ডিবি ওসি সাইফুল আলম মেহেরপুরে জুয়ার প্রাদুর্ভাবের কথা স্বীকার করলেও নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সরাসরি এড়িয়ে যান। তবে গণমাধ্যমের কাছে তিনি দাবি করেন, মেহেরপুরে প্রতি মাসে হাজার কোটি টাকার অনলাইন জুয়ার ব্যবসা হয়, তবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের চাপে পুলিশ তা পুরোপুরি নির্মূল করতে পারেনি।
গত ৫ আগস্টের পর সারা দেশে পুরো পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং বিতর্কিত পুলিশ সদস্যরা আত্মগোপনে গেলেও সাইফুল আলমের ক্ষেত্রে দেখা গেছে একেবারে ভিন্ন দৃশ্যপট। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আইজিপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে কোনোভাবেই আইনের আওতায় আনা হয়নি। উল্টো মেহেরপুর থেকে সরিয়ে প্রথমে তাঁকে ঢাকা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় পদায়ন করা হয়। পরবর্তীতে গত ৩১ জুলাই ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা আক্তার স্বাক্ষরিত এক আদেশের মাধ্যমে তাঁকে সাভার মডেল থানার নতুন ওসি হিসেবে পুনর্বাসিত করে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
জুলাই আন্দোলনে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা সাইফুল আলমকে সাভারের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর থানায় পদায়ন করায় তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান এবং মেহেরপুর জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হুসাইন। মেহেরপুর জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হুসাইন অত্যন্ত আবেগভরে বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতনকারী ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সাইফুল আলমের স্থান হওয়ার কথা ছিল কারাগারে, অথচ তাঁকে শাস্তি না দিয়ে সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ থানায় পুনর্বাসিত করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের সাথে চরম প্রতারণা।
জুলাই আন্দোলনের রক্তের দাগ না শুকাতেই ফরহাদ হোসেনের ঘনিষ্ঠ ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত সাইফুল আলমের এই পদায়ন পুরো ঢাকা অঞ্চলেই সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন ও গভীর অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল চেতনা বাস্তবায়নে এমন বিতর্কিত ওসিকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার ও জবাবদিহিতার মুখোমুখি করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন মেহেরপুর ও সাভারের ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা।