আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: জামালপুরের মাদারগঞ্জে রাজনীতি ও স্থানীয় সচেতন মহলজুড়ে চরম তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে মাদক সেবনের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর। মাদারগঞ্জ উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি ও উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আনোয়ার জাহিদ মাখনের ইয়াবা সেবনের একটি ভিডিও সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আসিফ বিল্লাহ ওরফে অনিক নামে আরও এক ব্যক্তির ইয়াবা সেবনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযুক্ত আসিফ বিল্লাহ মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি বেলাল হোসেনের ছেলে। একের পর এক এমন স্পর্শকাতর চিত্র প্রকাশ্যে আসায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিও ভাইরালের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটার পরও আনোয়ার জাহিদ মাখনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন মাঠপর্যায়ের কর্মী ও সমর্থকেরা। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, উপজেলা বিএনপি কি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সত্যিই কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে, নাকি অনিয়ম ধামাচাপা পড়ে যাবে? অনেকেই আনোয়ার জাহিদ মাখনের পেছনের শক্তির উৎস নিয়েও নানা ধরনের প্রশ্ন তুলছেন।

নথিপত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ সেপ্টেম্বর রাতে প্রায় ১ মিনিট ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি টিনশেডের ঘরের ভেতরে আনোয়ার জাহিদ মাখনের পাশে এক ব্যক্তি বসে আছেন। ভিডিওতে সেই ব্যক্তিকে পাইপসদৃশ একটি বস্তু ব্যবহার করে মাদক সেবন করতে দেখা যায়। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন দলীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ। তারা দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি আনোয়ার জাহিদ মাখনকে পদ থেকে অব্যাহতির আদেশ দিতে উপজেলা, জেলা ও কেন্দ্রীয় বিএনপি এবং শ্রমিক দলের উচ্চপর্যায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তৃণমূলের কর্মীরা।
ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয় যখন ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিকে নির্দোষ প্রমাণের এক অপচেষ্টা চালানো হয়। গত ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্যাড ও সরকারি লোগো ব্যবহার করে তৈরি করা একটি কথিত ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্ট ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে ওই কথিত ফরেনসিক রিপোর্টের সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শুরুতেই মারাত্মক প্রশ্ন ওঠে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে ঘটনার আসল চিত্র ধরা পড়ে। বিজিডি ই-গভ সার্টি প্রকল্পের পরিচালক, প্রকল্প সহকারী সিস্টেম এনালিস্ট এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নাজমুল হক খন্দকার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সেই ফরেনসিক রিপোর্টটি সম্পূর্ণ এডিট করা বা জাল। তাদের দপ্তর থেকে এই ধরনের কোনো কেস তদন্ত করা হয়নি এবং কোনো প্রকার ফরেনসিক রিপোর্ট ইস্যু করা হয়নি। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ভুয়া রিপোর্ট তৈরির এই অপরাধমূলক কাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির কাছে পাঠানো হয়েছে। তারা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেবে।

এদিকে বালিজুড়ী এলাকার বাসিন্দা সুমন জানান, আসিফ বিল্লাহ ওরফে অনিকের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড রয়েছে। ২০২১ সালে মাদারগঞ্জ থানায় দায়ের করা একটি নিয়মিত মাদক মামলায় তিনি দীর্ঘকাল কারাভোগ করেছিলেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসিফ বিল্লাহ ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকটি আইডি থেকে তথ্য প্রযুক্তি বিভাগের সেই ভুয়া ও এডিট করা ফরেনসিক রিপোর্টটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে রিপোর্টটি জাল প্রমাণিত হওয়ার পর এবং সার্বিক সমালোচনা শুরু হলে সেই পোস্টগুলো আইডি থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। সুমন আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, আসিফ বিল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় চাঁদাবাজি ও নানা অপকর্ম পরিচালনা করে আসছেন এবং এসব সংক্রান্ত কিছু ভিডিও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
দলীয় অপকর্ম ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের চরম হতাশার কথা ব্যক্ত করেছেন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। বিএনপি কর্মী সুলতান জানান, এই ধরনের অনৈতিক কাজের ভিডিও প্রকাশ পাওয়ায় দলের দীর্ঘদিনের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। তৃণমূলের সাধারণ কর্মীদের একটাই দাবি, উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি ও উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আনোয়ার জাহিদ মাখনকে অবিলম্বে দলীয় পদ থেকে চিরতরে বহিষ্কার করতে হবে। ভিডিওগুলো সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়ায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে কর্মীদের। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন যে, অভিযুক্ত আসিফ বিল্লাহ বিএনপির প্রভাবশালী স্বজনদের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সাংবাদিক ও দলের ত্যাগী নেতাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট দিয়ে আসছেন। প্রকৃতপক্ষে আসিফ বিল্লাহ একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং তাকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে গ্রেফতারের জোর দাবি জানান তিনি।
ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে মাদারগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ স্নেহাশীষ রায় জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি পুলিশের নজরে এসেছে এবং তারা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে অপরাধের গভীর তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে আইনগত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়ার বিষয়ে জামালপুর জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক বাবু জীবন কৃষ্ণ বসাক জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা অবগত আছেন। বিষয়টি নিয়ে জামালপুর জেলা শ্রমিক দলের সভাপতির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে খুব শিগগিরই সমন্বিত ও দৃষ্টান্তমূলক দলীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে সার্বিক বিষয়টি নিয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজুর কাদের বাবুল খান বলেন, ভাইরালের ঘটনাটি এবং ভিডিওচিত্রগুলো তাদের সম্পূর্ণ নজরে এসেছে। পুরো বিষয়টি তারা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839