রাজধানীর উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরে সরকারি জমি দখল, অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণ এবং অবৈধ পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে বড় ধরনের একটি অস্বস্তিকর চিত্র সামনে এসেছে। ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ বা ঢাকা ওয়াসা ওই এলাকায় অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জোর আবেদন জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয়ভাবে ‘প্রতিবন্ধী মজিবর’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে ঘিরে সরকারি সম্পত্তি দখল ও ভাড়া বাণিজ্যের পুরো বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার জোন-১০-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান গত ২০ জুলাই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে অবৈধ পানি ব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছিল। এর ভিত্তিতে ওয়াসার একটি দল সরেজমিনে গিয়ে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণ পায়। পরিদর্শনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ১৫ নম্বর সেক্টরের ব্লক-বি, কূপ নং-২১ এর কাছে পানির পাম্পের পশ্চিম পাশে মজিবর নামের ওই ব্যক্তি কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই একটি টিনশেড ঘর তুলে অবৈধভাবে পানির সংযোগ নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ওই একই এলাকার হাউস-৭, ব্লক-বি, রোড-১/বি এর একটি বৈধ পানির মিটারের বাইপাস তৈরি করে একটি হোটেল ও একটি মুদির দোকানে অনৈতিকভাবে সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব অবৈধ সংযোগ কাটতে গেলে পরিদর্শকদের স্থানীয়ভাবে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। যার ফলে জনস্বার্থ রক্ষা, সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব সুরক্ষার তাগিদে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে জরুরি আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
এদিকে স্থানীয় সূত্র থেকে দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্ত মজিবুর রহমান ওরফে ‘প্রতিবন্ধী মজিবর’ দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সরকারি জমি নিজের দখলে রেখেছেন। জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট এক নেতা সুমনের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা মিলে রাজউকের প্রায় ২১ কাঠা জায়গা দখল করে নিয়েছেন। সেখানে একাধিক টিনশেড ঘর তুলে নিয়মিত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। স্থানীয় লোকজনের মতে, বর্তমানে ওই দখলকৃত জমির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা। মজিবুর রহমান নিজেও ওই এলাকায় পরিবারসহ থাকেন বলে জানা যায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দখলের পর থেকে সেখানে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে বিপুল অংকের ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া হয়েছে। তবে এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে মজিবুর রহমানের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে রাজউক জোন-১-এর এক্সিকিউティブ ম্যাজিস্ট্রেট শান্তা রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সরাসরি মন্তব্য করতে সম্মত হননি। তিনি তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনার জন্য রাজউকের অথরাইজড অফিসারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরবর্তী সময়ে রাজউক জোন-১-এর অথরাইজড অফিসার এহসানুল ইমাম জানান, রাজউক চেয়ারম্যানের নির্দেশে অভিযোগ পাওয়ার পর গত ২০ জুলাই উত্তরা সেক্টর-১৫ এর এ, বি এবং ডি ব্লকের লেক-সংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। তখন বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা আংশিকভাবে ভেঙে ফেলা হলেও মানবিক দিক বিবেচনা করে বাকি স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, নির্ধারিত এই সময় পার হয়ে গেলে অফিসের নিয়ম অনুযায়ী ফের সেখানে অভিযান চালানো হবে। মজিবুর রহমানের একটি আবেদনের বিষয়টি স্পষ্ট করে এই কর্মকর্তা জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি ওই জমিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি চেয়ে রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজউক তা অনুমোদন দেয়নি, ফলে সেখানে তার কোনো বৈধ অধিকার নেই।
রাজউকের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাকে দুই মাসের মধ্যে অন্য জায়গায় চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময় শেষ হলেই তার সব স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ১৫ নম্বর সেক্টরের লেকপাড় এলাকা জুড়ে ৫৫টিরও বেশি টিনশেড ঘর রয়েছে। এসব ঘর থেকে প্রতি মাসে দুই হাজার থেকে শুরু করে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া তোলা হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে এই কাজ চললেও রহস্যজনকভাবে কোনো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি ওয়াসার কঠোর পদক্ষেপ এবং রাজউকের আংশিক অভিযানের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বেশ তোলপাড় শুরু হয়েছে। জানা গেছে, মজিবুর রহমানের দুটি পরিবার রয়েছে এবং তার পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় ২১ জন, যাদের সবাইকে নিয়ে তিনি এই অবৈধ জায়গায় বসবাস করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি মজিবুর রহমানের সাথে কথা বলতে গেলে তিনি সংক্ষেপে বলেন যে, তিনি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ এবং অনেক কষ্টে রাজউকের জমিতে ঘর বানিয়েছেন। আপনারা তাকে কেন বিরক্ত করছেন—এই প্রশ্ন তুলে তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।
তবে তার এই বক্তব্যকে আবেগ দেখিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, মজিবর বাস্তবে একজন ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী এবং সরকারি জমি দখল করাই তার পেশা। নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধিতাকে তিনি আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেন এবং পুলিশ বা কোনো সংস্থা অভিযান চালাতে এলেই এই বিষয়টিকে সামনে এনে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। আরেক বাসিন্দা জাজ মিয়া নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, শারীরিক অক্ষমতা থাকলেও মজিবর এখন প্রায় ৫০ কোটি টাকার সরকারি জায়গা দখল করে কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। তাকে কোনোভাবেই সাধারণ বা অসহায় বলা চলে না। কেবল জমি দখলই নয়, পুরো এলাকায় ক্ষতিকর মাদক ব্যবসার পেছনেও তার হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।