• সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০১:০১ অপরাহ্ন
শিরোনাম
মিঠাপুকুরের দস্যুতা মামলার প্রধান আসামি সাভার থেকে গ্রেফতার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পুলিশি সেবা পৌঁছানোর প্রত্যয়, আইজিপির বগুড়া সফর ঘিরে নতুন উদ্দীপনা ডোমারে ট্রাক ও মিথিলা পরিবহনের সংঘর্ষে চালকসহ দুজনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু সিরাজগঞ্জে র‌্যাবের অভিযানে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার পাগলাপীরে বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের নতুন কমিটি গঠন বীরগঞ্জে তিন দিনব্যাপী ভূমি সেবা মেলার সূচনা: ডিজিটাল সেবায় গুরুত্বারোপ গঙ্গাচড়ার বেতগাড়ী ইউপিতে ঈদুল আযহা উপলক্ষে ভিজিএফের চাল বিতরণ পীরগঞ্জে ডিবির অভিযানে ৮ অনলাইন ক্যাসিনো জুয়ারি গ্রেফতার ডোমারে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ উদযাপন: অগ্নি নিরাপত্তার বার্তা নিয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজন পঞ্চগড়ে উন্নত জাতের বোরো ধানে বাম্পার ফলন, হাসি ফুটেছে কৃষকের মুখে

আবারও গলা চেপে ধরা হলো সিটিসেলের

সংবাদদাতা:
শনিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৫

আই জামান চমক: এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় মোবাইল ফোন অপারেটর সিটিসেলের বাজারে ফেরা নিয়ে যখন উত্তেজনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই এই অপারেটরটির মালিকানা এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালতের কড়া পদক্ষেপ টেলিকম জগতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রায় এক দশক আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর আইনি পদক্ষেপ স্বভাবতই অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

বেসরকারি খাতের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক বা ইউসিবির ৪৯ কোটি টাকার ঋণখেলাপির মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিটিসেলের মালিক এম মোরশেদ খান, তার স্ত্রী নাসরিন খান ও ছেলে ফয়সাল মোরশেদ খানসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। বন্ধ হয়ে যাওয়া মোবাইল ফোন অপারেটর সিটিসেলের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই এমন কঠোর আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা টেলিকম বাজার বিশ্লেষক ও সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

অনেকে ভাবছেন, সিটিসেল যাতে মার্কেটে না আসতে পারে তার জন্য এর পিছনে একচেটিয়া ব্যবসা করা বড় মোবাইল অপারেটরদের হাত রয়েছে। নয়তো তাদের ফিরে আসার ঘোষণার পরই কেন ঘটবে এমন ঘটনা? এই প্রশ্নটি এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে। বৃহস্পতিবার ঢাকার অর্থঋণ আদালত ৫-এর বিজ্ঞ বিচারক মুজাহিদুর রহমান এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আদেশ দেন। আদালতের আদেশে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ৪৯ কোটি ৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকার খেলাপি ঋণ পরিশোধে বাধ্য করার জন্য এই গ্রেপ্তারের আদেশ দেওয়া হলো।

এটি ছয় মাসের দেওয়ানি আটকাদেশ। আদালত অর্থঋণ আদালত আইনের ৩৪ (১) ধারার ব্যাংকের আবেদন মঞ্জুর করে এই আদেশ দিয়েছেন। আর এই আদেশ কার্যকর করার জন্যই অর্থঋণ আদালত আইনের ৩৫ ধারা অনুযায়ী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করা হয়েছে। কিন্তু এই মামলাটি হঠাৎ করে এত বছর পর কেন সামনে এলো? ইউসিবি ব্যাংক ২০১৪ সালের জুনে এই মামলাটি দায়ের করেছিল। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, সিটিসেল কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির কিছু গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের জন্য ইউসিবি ব্যাংক থেকে এই বিপুল পরিমাণ টাকা ঋণ নিয়েছিল। ঋণের টাকা পরিশোধের নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হয়ে গেলেও যখন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তখনই ইউসিবি ব্যাংক অর্থঋণ আদালতে মামলা করে। মামলায় সিটিসেল ছাড়াও মালিক পক্ষের ব্যক্তি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীসহ মোট নয়জনকে আসামি করা হয়েছিল।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালত এবার এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিলো। এই তালিকায় মোরশেদ খান এবং তাঁর স্ত্রী ও ছেলে ছাড়াও আরও যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, তারা হলেন, মহাখালী, সিটিসেল ভবন, প্যাসিফিক সেন্টারের বাসিন্দা সিটি সেলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আসগর করিম। এছাড়া একই ঠিকানার বাসিন্দা সিটিসেলের সাবেক ইঞ্জিনিয়ার জাপানের নাগরিক ও সাবেক কর্মী হিরোয়ুকি কন্ডোহ, সিঙ্গাপুরের নাগরিক ইয়ো এং চোক, এলান ওং তুয়ান কেং ও এডগার হার্ডলেস। তবে, এই একই মামলায় প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার বা সিএফও সাজ্জাদ রহিম চৌধুরীকে গ্রেফতার করার পর জামিন দেওয়া হয়েছে। গুলশান থানা পুলিশ ৯ জন আসামির মধ্য থেকে একমাত্র তাঁকেই গ্রেপ্তার করে গতকাল অর্থঋণ আদালতে হাজির করে। আদালত সাজ্জাদ রহিম চৌধুরীর জামিন মঞ্জুর করার সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। সাজ্জাদ রহিম চৌধুরী ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সিটিসেলের সিএফও ছিলেন। কিন্তু ইউসিবির ঋণ জালিয়াতির মামলাটি হয়েছে ২০১৪ সালের জুনে, অর্থাৎ তিনি দায়িত্ব ছাড়ার পরে। তিনি ঋণগ্রহীতা কোম্পানির পরিচালক বা এর গ্যারান্টর হিসেবে ছিলেন না। তিনি কেবল বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন।

এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে সমন জারি হলেও তাঁকে সে বিষয়ে সঠিকভাবে অবহিত করা হয়নি বলেও আদালতে প্রতীয়মান হয়েছে। সব মিলিয়ে এই মামলায় তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকার কারণেই আদালত তাঁর জামিন আবেদন মঞ্জুর করেছেন। সিএফও’র জামিন মঞ্জুরের এই বিষয়টি প্রকারান্তরে মামলাটির মূল আসামিদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রমাণ উপস্থাপনে যে দুর্বলতা থাকতে পারে, সেই প্রশ্নটি তুলে ধরে। একদিকে যখন মালিকপক্ষ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, ঠিক তখনই একজন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার জামিন প্রমাণ করে যে, আইনি প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট জটিল। সিটিসেল ছিল বাংলাদেশের প্রথম মোবাইল ফোন অপারেটর। ১৯৯৩ সালে বিটিআরসির লাইসেন্স পেয়ে প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যক্রম শুরু করে।

সিটিসেল একমাত্র সিডিএমএ (CDMA) টেকনোলজি ব্যবহার করে সার্ভিস দিত, যেখানে অন্য অপারেটররা জিএসএম (GSM) টেকনোলজি ব্যবহার করত। একসময় এর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকলেও, প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং জিএসএম অপারেটরদের আগ্রাসী বাজার নীতির সঙ্গে সিটিসেল তাল মেলাতে পারেনি। বিশেষ করে থ্রিজি ও ফোরজি প্রযুক্তির যুগে তারা পিছিয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে সরকার এবং বিটিআরসির কাছে লাইসেন্স ফিসহ প্রায় পাঁচশ কোটি টাকার বকেয়া এবং গ্রাহক সংখ্যা কমতে থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে।

২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে বিটিআরসি আনুষ্ঠানিকভাবে সিটিসেলের লাইসেন্স বাতিল করে এবং তাদের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে। এই বন্ধ হওয়ার পেছনে যেমন ছিল প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, তেমনি ছিল অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং বিশাল অঙ্কের ঋণ। আর সেই ঋণের অংশই এখন নতুন করে আইনি জটিলতা তৈরি করেছে। এই ঘটনা এমন এক সময় ঘটল, যখন সিটিসেল বাজারে ফিরতে চেয়েছিল এবং বাংলাদেশের টেলিকম বাজারে একচেটিয়া ব্যবসার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার বার্তা দিয়েছিল। সিটিসেল ঘোষণা করেছিল, তারা আগের মতোই সর্বনিম্ন ২৫ পয়সা কলরেট রাখবে।

এর পাশাপাশি তারা আনলিমিটেড মেয়াদের ইন্টারনেট প্যাকেজ দেওয়ার কথাও জানিয়েছিল, যা টেলিকম গ্রাহকদের জন্য ছিল এক নতুন দিগন্ত। বর্তমানে বাংলাদেশের টেলিকম বাজারে যে কয়েকটি অপারেটরের একচেটিয়া আধিপত্য চলছে, তাদের জন্য সিটিসেলের এই ধরনের ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি বড় হুমকি ছিল। সর্বনিম্ন কলরেট এবং মেয়াদবিহীন ইন্টারনেটের মতো সুবিধা অন্যান্য অপারেটরের গ্রাহক হারাতে বাধ্য করত। গ্রাহকরা তখন সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা নিতে পারতেন, যার ফলে বর্তমান অপারেটরদের মুনাফা কমে যেত। এই কারণেই অনেকেই মনে করছেন, সিটিসেলের এই ফেরাটা কিছু প্রভাবশালী অপারেটরদের জন্য ছিল ঘুম হারাম হওয়ার মতো ঘটনা। তবে সিটিসেলের বাজারে ফেরা নিয়ে প্রথম থেকেই নানা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল।

খবর এসেছিল, দেশের অন্যতম প্রধান একটি অপারেটর গোপনে সিটিসেলের ফিরে আসায় বাধা সৃষ্টি করছে। আর ঠিক তার পরেই এই সিএফও আটক এবং মালিকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির মতো পদক্ষেপকে অনেকে সেই গোপন ষড়যন্ত্রেরই অংশ বলে মনে করছেন। সিটিসেলের প্রত্যাবর্তন মানেই বাংলাদেশের টেলিকম বাজারে একটা বিরাট পরিবর্তন আসা। এই কারণে সিটিসেল প্রেমীরা এবং সাধারণ গ্রাহকরা মনে করছেন, প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট সিটিসেলকে বাজার থেকে দূরে রাখতে চায়।

তাদের আশঙ্কা, সিটিসেলকে বাধাগ্রস্ত করতেই পুরনো এই ঋণ খেলাপির মামলাকে সামনে আনা হয়েছে এবং এটা এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। এই পরিস্থিতিতে এম মোরশেদ খান এবং সিটিসেলের মালিকদের বিরুদ্ধে আদালতের পদক্ষেপ তাদের টেলিকম বাজারে ফিরে আসার প্রক্রিয়াকে কার্যত থামিয়ে দিতে পারে।

৪৯ কোটি টাকার ঋণ খেলাপির মামলাটি যদি দ্রুত নিষ্পত্তি না হয় এবং মালিকরা যদি আইনি প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়েন, তবে নতুন করে বিনিয়োগ এবং অপারেটর হিসেবে লাইসেন্স ফিরে পাওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, এই ঘটনার ফলে টেলিকম সেক্টরের বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা দ্বিধায় ভুগতে পারে। আপনার কী মনে হয়? সিটিসেলের মালিকদের বিরুদ্ধে এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে কি কেবলই আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত, নাকি এর পেছনে টেলিকম বাজারের প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে? এই ঘটনা বাংলাদেশের টেলিকম বাজারে কতটা প্রভাব ফেলবে? আপনার মতামত কমেন্ট করে জানান।


More News Of This Category