• সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১১ অপরাহ্ন
শিরোনাম
গঙ্গাচড়ায় আমেরিকান প্রযুক্তি নির্ভর ডেইরি ফার্ম ও ঐতিহ্যবাহী তেলের ঘানি পরিদর্শনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাদক মুক্ত সমাজ গড়তে তরুণদের মাঠে টানার আহ্বান রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের দেবীগঞ্জে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত সভার আয়োজন দেবীগঞ্জে বিএনপি নেতা ও ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে বিধবা ভাতার টাকা আত্মসাতের লিখিত অভিযোগ ইউএনও’র কাছে: ন্যায় বিচারের দাবি করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার বিদ্রোহী কবির ঘরে ফেরা, এক অতৃপ্ত প্রেমের গল্প গঙ্গাচড়ায় মেলা আয়োজন নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ: চেক-স্ট্যাম্প দেখিয়ে তদন্তের দাবি কৃষক দল নেতার গঙ্গাচড়ায় নির্জন স্থান থেকে বৃদ্ধের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার, নেপথ্যে অজানা কারণ হাজারীবাগের মাদক নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে রাজেশ ও নিখিল, রাজনৈতিক প্রভাব ও সোর্স পরিচয় ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ মাদক পরিহার করে মেধাকে দেশ গঠনে কাজে লাগানোর আহ্বান পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির টানে বীরগঞ্জে মেলা: পাতা খেলাকে ঘিরে উৎসবে মাতলো দু’মুখা বাজার

বিদ্রোহী কবির ঘরে ফেরা, এক অতৃপ্ত প্রেমের গল্প

আই জামান চমক, ঢাকা
রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

আই জামান চমক, icrbd24: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের গায়ে এখনো বিকেলের রোদ এসে পড়ে ঠিক আগের মতোই। মসজিদের পাশের সেই ছোট্ট কবরটার ওপর ছায়া ফেলে একটা গাছ, নাম জানি না তার, তবে পাতাগুলো নড়ে ওঠে হাওয়ায় যেন কেউ নিঃশব্দে কিছু বলতে চায়। আমি দাঁড়িয়ে থাকি কিছুক্ষণ। প্রতিবারই দাঁড়াই। মানুষ হেঁটে যায় ব্যস্ত পায়ে, ফোনে কথা বলতে বলতে, কেউ ফিরেও তাকায় না। অথচ এই মাটির নিচে শুয়ে আছেন এমন একজন, যাঁর কলম একদিন কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত। কাজী নজরুল ইসলাম। বিদ্রোহী কবি। প্রেমিক কবি। আর সবচেয়ে বড় কথা, একজন মানুষ, যাঁকে জীবদ্দশায় এই সমাজ, এই রাষ্ট্র ঠিকমতো চিনতেই পারেনি।

গতকাল ছিল তাঁর পঞ্চাশতম প্রয়াণ দিবস। পঞ্চাশ বছর। একটা প্রজন্ম পুরো বদলে যায় এই সময়ে, নদীর গতিপথ বদলায়, অথচ নজরুলের কবিতা এখনো তেমনই তাজা, তেমনই ধারালো। কেন এমন হয়? হয়তো এই কারণেই যে, যে কথাগুলো তিনি লিখেছিলেন, সেগুলো কোনো এক সময়ের কথা ছিল না, ছিল মানুষের চিরন্তন যন্ত্রণা আর প্রতিবাদের কথা।

নজরুলের জীবনের একটা অধ্যায় নিয়ে আমরা কথা বলি কম, অথচ সেটা তাঁকে বোঝার জন্য জরুরি। দুই নারী। নার্গিস আর প্রমীলা। ১৯২১ সালে কুমিল্লায় এসে প্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, আর সেই সূত্রেই দৌলতপুরে গিয়ে প্রেমে পড়েন আলী আকবর খানের ভাগনি সৈয়দা আসার খানমের। কবি নিজেই তাঁর নাম রাখলেন নার্গিস। ভালোবাসা যখন গভীর হচ্ছিল, বিয়ের কথাও পাকা হলো। কিন্তু শর্ত এলো, ঘরজামাই হয়ে থাকতে হবে দৌলতপুরে। যে মানুষটা সারাজীবন কারো কাছে মাথা নোয়াননি, শৃঙ্খল মানেননি, তিনি কী করে মেনে নেবেন এই শর্ত? বিয়ের পরদিনই তিনি চলে গেলেন। নার্গিসকে ফেলে রেখে। এই যে চলে যাওয়া, এটা কি অভিমান ছিল, নাকি আত্মমর্যাদার প্রশ্ন, নাকি দুটোই একসাথে জড়িয়ে গিয়েছিল বুকের ভেতর? আমরা ঠিক জানি না। শুধু জানি, “আজও মধুর বাঁশরি বাজে” এর মতো গানে সেই বিরহের সুর রয়ে গেছে চিরকালের জন্য।

তারপর এলেন আশালতা সেনগুপ্তা। কুমিল্লার সেনবাড়িতে বেড়ে ওঠা মেয়েটির সঙ্গে বন্ধুদের সূত্রে পরিচয়, আর সেই পরিচয় গড়িয়ে গেল ভালোবাসায়। পরিবারের বাধা ছিল প্রবল, সমাজের চোখরাঙানি ছিল আরও প্রবল। তবু ভালোবাসা জিতে গেল শেষপর্যন্ত। ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল কলকাতায় বিয়ে হলো, আর কবি তাঁর কিশোরী বধূর নতুন নাম দিলেন প্রমীলা। নার্গিস যদি হন একটা না বলা কথার মতো, একটা অসমাপ্ত গানের মতো, তাহলে প্রমীলা ছিলেন তাঁর জীবনের প্রকৃত সঙ্গী, সুখে দুঃখে দারিদ্র্যে অসুখে একসাথে হাঁটা এক নারী। “তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়” গানটা যখনই শুনি, মনে হয় এই গানের ভেতর দিয়ে কবি আসলে প্রমীলাকেই বলে গেছেন, তুমি আছো বলেই আমি টিকে আছি।

কিন্তু ভালোবাসার গল্প বলাটা সহজ, তার পরের গল্পটা বলা কঠিন। যখন কবি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, রোগ তাঁর শরীর আর কণ্ঠস্বর দুটোই কেড়ে নিতে শুরু করল, তখন এই রাষ্ট্র কোথায় ছিল? তৎকালীন নেতৃত্ব, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক থেকে খাজা নাজিমুদ্দিন কিংবা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, কারো কাছ থেকেই সময়মতো চিকিৎসার সহায়তা এলো না। কেন এলো না, সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে কবির নিজের অসাম্প্রদায়িক আর স্পষ্টভাষী অবস্থানের মধ্যেই। সত্য কথা বলা মানুষদের ভাগ্যে প্রায়ই এমনটা ঘটে। যখন রাষ্ট্র সচেতন হলো, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। রোগ তাঁকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে।

এখানে একটা প্রশ্ন করি নিজেকেই। আমরা কি এখনো একই ভুল করি না? আমাদের চারপাশে এমন কতজন সৎ, সাহসী, সত্যভাষী মানুষ ধুঁকে ধুঁকে দিন কাটান, অথচ আমরা তাকাই না ফিরে? তারপর একদিন হঠাৎ তারা চলে গেলে আমরা শোকসভা করি, স্মরণসভা করি, লম্বা লম্বা কথা বলি। এই যে দেরিতে ভালোবাসা জাগা, এটা আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

১৯৭২ সালের ২৪ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরম শ্রদ্ধায় অসুস্থ কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে এলেন, রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা দিলেন। দেরিতে হলেও এই সম্মান জরুরি ছিল। আর কবির নিজের ইচ্ছা, “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই”, সেই অনুযায়ী ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁকে সমাহিত করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়।

নজরুলকে শুধু প্রেমের কবি বললে ভুল হবে, শুধু বিদ্রোহের কবি বললেও অসম্পূর্ণ থেকে যায় কথাটা। “রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”, “তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে”, “আমি যদি আরব হতাম মদিনার ঐ পথ”, এই গানগুলো শুনলে বোঝা যায় সৃষ্টিকর্তা আর রাসুলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কতটা গভীর ছিল। বাংলা ভাষায় ইসলামী সংগীতের যে নতুন দিগন্ত তিনি খুলে দিলেন, তার তুলনা মেলা ভার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার বলেছিলেন, মৃত্যুর মধ্য দিয়েই জীবনের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায়। নজরুলের বেলাতেও তা সত্য হয়ে দাঁড়ায় বারবার। পঞ্চাশ বছর পরও তাঁর গান বাজে ঈদের সকালে, তাঁর কবিতা আওড়ে ওঠে প্রতিবাদের মিছিলে, তাঁর প্রেমের গান গুনগুন করে ওঠে কোনো নিভৃত সন্ধ্যায়। এই বেঁচে থাকা কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় বাঁধা যায় না, বাঁধা যায় শুধু মানুষের হৃদয়ে।

আজ যখন মসজিদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, মনে হয় কবরের নিচে শুয়ে থাকা মানুষটা কিছু একটা জিজ্ঞেস করছেন আমাদের। তুমি কি এখনো সত্য বলতে ভয় পাও? তুমি কি এখনো ভালোবাসাকে শর্তের কাছে বিক্রি করে দাও? উত্তরটা প্রতিটা মানুষকে নিজের বুকের ভেতর খুঁজে নিতে হবে। কবি শুধু প্রশ্নটা রেখে গেছেন। বাকিটা আমাদের।

লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।

হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839


এরকম আরও সংবাদ