রংপুরের গঙ্গাচড়ায় আধুনিক পদ্ধতিতে পরিচালিত ডেইরি খামার পরিদর্শন, খামারে তৈরি টাটকা দুধ পান এবং গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী তেলের ঘানি ঘুরে দেখলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। রোববার সকালে গঙ্গাচড়ার বেতগাড়ী ইউনিয়নে প্যারাগন এগ্রো অ্যান্ড ডেইরি লিমিটেডের খামার পরিদর্শনে যান তিনি। এর পর একই ইউনিয়নের চন্দনের হাটে গিয়ে সরিষা থেকে ঘানিতে তেল তৈরির সনাতন পদ্ধতি প্রত্যক্ষ করেন।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে খাপরিখাল এলাকায় অবস্থিত প্যারাগন এগ্রো অ্যান্ড ডেইরি লিমিটেডের ডেইরি ফার্মে পৌঁছান মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ডিয়েন ডাওসহ মার্কিন দূতাবাসের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা। খামার ঘুরে দেখার সময় উন্নত জাতের প্রায় ১ হাজার ২০০ গরুর সার্বিক পরিচর্যা ও পালন কার্যক্রম সম্পর্কে রাষ্ট্রদূতকে বিস্তারিত জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গাভির দৈনন্দিন যত্ন, আধুনিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা, প্রতিদিনের দুধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আমেরিকান প্রযুক্তিতে উন্নত জাতের প্রজনন পদ্ধতি নিয়ে আলোকপাত করেন খামার কর্তৃপক্ষ।
প্যারাগন ডেইরির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, খামারের দুধ উৎপাদন আশানুরূপভাবে বাড়াতে গরুর পুষ্টির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি আমদানি করা উচ্চমানের সয়াবিন ও ভুট্টাসহ নানা পুষ্টিকর পশুখাদ্য উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি আমেরিকান জেনেটিক্স প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ ঘটিয়ে উন্নত জাতের গরু পালনের ধারাবাহিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পরিদর্শনকালে খামারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। আলোচনার একপর্যায়ে খামারে উৎপাদিত খাঁটি দুধ পান করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
খামার পরিদর্শন শেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, উন্নত জেনেটিক্স ও মানসম্মত পশুখাদ্যের প্রয়োগ বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতের সার্বিক উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এসব কৃষিপণ্যের প্রসারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক ও রপ্তানিকারকদের জন্যও বাংলাদেশে নতুন বাণিজ্যিক বাজারের উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
ডেইরি খামার পরিদর্শন শেষ করে বেতগাড়ী ইউনিয়নের চন্দনের হাটে যান মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। সেখানে গ্রামবাংলার শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী তেলের ঘানি ঘুরে দেখেন তিনি। কাঠের ঘানিতে বলদ দিয়ে ঘুরে ঘুরে সরিষা থেকে তেল উৎপাদনের প্রাচীন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কারিগরদের কাছে গভীরভাবে জানতে চান এবং এই পেশার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। গ্রামবাংলার এই পুরোনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি স্বচোখে দেখে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ঘানিভাঙা সরিষার তেল তৈরির ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিটি গ্রামবাংলায় এখনও সুন্দরভাবে টিকে রয়েছে, যা দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগল।
রাষ্ট্রদূতের এই সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী ডিয়েন ডাও, মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা নিকোল ক্লারিসা বেসনার্ড, কর্মকর্তা সৈয়দ ফাইজুস সালেহিন এবং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ফিরোজ আহমেদ। এ সময় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আব্দুল হাই সরকার, রংপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান, গঙ্গাচড়া মডেল থানার ওসি আব্দুস ছবুর এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান।
পরিদর্শন কর্মসূচি সম্পন্ন করে সকাল ১১টার দিকে লালমনিরহাটের তিস্তা ব্যারেজ পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে গঙ্গাচড়া এলাকা ত্যাগ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, প্যারাগন ডেইরি ফার্মে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই আকস্মিক সফর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাতের পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে। উন্নত আমেরিকান জেনেটিক্স ও মানসম্মত পশুখাদ্যের কার্যকর ব্যবহার যেমন বাংলাদেশের ডেইরি খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি করবে, ঠিক তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক ও রপ্তানিকারকদের জন্যও বাংলাদেশের মতো উদীয়মান বাজারে বাণিজ্য প্রসারের নতুন দুয়ার উন্মোচন করবে।