আই জামান চমক: জীবনে এমন অনেক সময় আসে যখন আমরা চাক্ষুষ প্রমাণ অথবা লোকমুখে শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে দ্রুত একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হই। কিন্তু মানব জীবনের জটিল আখ্যান প্রায়শই তার বাইরের আবরণের চেয়ে ভেতরের কন্দরে অনেক বেশি সত্য ধারণ করে। আমরা অনেক সময় রিপনকে নিয়ে কিছু লিখিনি বটে, কিন্তু আজ যখন সে এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার, যখন তাকে কেন্দ্র করে মিডিয়া ট্রায়ালের কশাঘাত, তখন তার পক্ষে কলম ধরা আমার কর্তব্য বলে মনে হয়। আমি চাই রিপনের পক্ষ নিতে।
রিপন মিয়ার সাম্প্রতিক বক্তব্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কর্পোরেট দুনিয়া কীভাবে একজন জনপ্রিয় শিল্পীকে ফাঁদে ফেলতে চায় এবং সেই সঙ্গে আঞ্চলিক হিংসাও কীভাবে তাকে গ্রাস করছে। রিপন নিজেই বলছেন, “মূল বিষয় হলো আমাদের নেত্রকোণার মানুষগুলো ভালো না। একজনের ভালো আরেকজন দেখতে পারে না।” একজন মানুষ যখন উঠে দাঁড়ান, তখন তাকে টেনে নামানোর চেষ্টা আমাদের সমাজের এক পুরোনো চিত্র।
কর্পোরেট জগতের জটিল ফাঁদে আজ রিপন আক্রান্ত। এই ফাঁদ এমনভাবে পাতা হয়েছে যে, একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনকে পুঁজি করে তাকে জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে। রিপনের ভাষ্যমতে, যখন তার অর্থ-প্রতিপত্তি আসা শুরু হলো, তখনই ঝামেলা শুরু। দুই কোটি টাকার চুক্তির অফার ফিরিয়ে দেওয়ার পরই যেন তার জীবনে নেমে এসেছে হুমকি আর হয়রানি। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, তারকাদের স্বাধীনতা এই কর্পোরেট লোভের কাছে কত ঠুনকো। মিডিয়া ট্রায়াল যেন তাকে সম্পূর্ণ শেষ করে দিতে চাইছে। কিন্তু আমার মনে হয়, রিপনদের মতো মজলুমদের পাশে সবসময় আল্লাহ্ থাকেন। কারণ মজলুমের আর্তি বৃথা যায় না।
জনপ্রিয় শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবন আর স্টারডমের চাহিদা বহু ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। রিপন মিয়া এর আগে অনেক সাক্ষাৎকারে তার বিয়ে ও সন্তানের বিষয়ে খোলামেলা কথা স্পষ্টভাবেই বলেছেন, কখনো তা অস্বীকার করেননি। অথচ, গতকাল হঠাৎ করে সেই বিষয়গুলো অস্বীকার করা বা গোপন করার চেষ্টা তার ওপর আসা চরম চাপের ইঙ্গিত দেয়। স্টারজিম বা কর্পোরেট চুক্তির স্বার্থে তাঁর উপদেষ্টাদের পরামর্শে এই পুরোনো কৌশল অবলম্বন করতে তিনি বাধ্য হচ্ছেন। এতেই প্রমাণিত হয়, কোনো অদৃশ্য শক্তি বা চুক্তির শর্ত তাকে এই মিথ্যাচার করতে বাধ্য করছে।
তাঁর লেখাপড়া না জানা সত্ত্বেও ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি ম্যানেজারের প্রসঙ্গ টানেন—এতে বোঝা যায়, তারকা হিসেবে তাকে অনেক কিছুই গোপন করে, ম্যানেজারের পরামর্শে চলতে হচ্ছে। রিপন মিয়ার শেষ কথাগুলো গভীর তাৎপর্য বহন করে: “কিছু কিছু জিনিস থাকে যেগুলো সরাসরি বলা যায় না, বুঝে নিতে হয়। কিছু জিনিস দেখেও চোখকে বলবো দেখো না, কানকে বলব শুনো না, এটাই বাস্তবতা।” এই কথাগুলোই প্রমাণ করে, তিনি এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। যেখানে সত্যকে লুকিয়ে রাখতে হচ্ছে, যেখানে বাধ্য হয়ে তাকে দুই কোটি টাকার চুক্তিতে যেতে হচ্ছে, কেবল ঝামেলা এড়াতে।
তবে এই প্রসঙ্গে একটা কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই—যদি রিপন অথবা অন্য যে কেউ কোনো অপরাধ করে থাকেন, তবে তার বিচার অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত। হুযুগে মেতে উঠে বিচার করার প্রবণতা বা কোনো কিছু না জেনেই তড়িঘড়ি করে কারও বিপক্ষে দৌড় দেওয়ার পক্ষে আমি নই। আইনের প্রতি আমি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। রিপন যদি সত্যি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তবে আইন তার বিচার করবে।
নিঃ সন্দেহে বলা যায়, নিজের প্রয়োজনে রিপন সাময়িকভাবে তার ব্যক্তিগত তথ্য গোপন করতে চেয়েছিল, হয়তোবা মিথ্যাও বলেছিল। এই কাজের জন্য সে অপরাধী। এই অপরাধের জন্য জাতির কাছে তার ক্ষমা চাওয়া উচিত। তবে একই সঙ্গে আমাদের সমাজের চোখে চোখ রেখে একটি কঠিন প্রশ্ন রাখা উচিত—রিপন কি তার সন্তানের কাছে একজন ভালো পিতা? সে কি তার স্ত্রীর কাছে একজন ভালো স্বামী? যদি তাদের ব্যক্তিগত জীবনে কোনো বড় ধরনের টানাপোড়েন না থাকে, তবে সমাজ বা অন্য কারোর কেন এত মাথাব্যথা হবে? জীবনের জটিলতা আর কর্পোরেট চক্রান্তের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে রিপন যেন তার ন্যায্য প্রাপ্যটুকু পায়—এই আমার একান্ত কামনা। প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হোক, আর মজলুমের মুক্তি আসুক।
-লেখক: কবি, সাংবাদিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী