আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের অনৈতিক তদবির না মানায় পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীকে বদলি করা হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিসিএস ২৫ ব্যাচের এই কর্মকর্তা, যিনি সম্প্রতি যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন, তাকে গত মঙ্গলবার হঠাৎ করেই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়। বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ এই সিদ্ধান্তকে সাধারণ ও নিয়মিত প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে দাবি করলেও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র একেবারেই ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।
ঘটনার নেপথ্যে জানা যায়, পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব প্রশাসনে অফিস সহায়ক বা পিয়ন পদে ১০টি শূন্য আসনে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছিল। এই নিয়োগে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর তার পছন্দের প্রার্থী জহিরুল ইসলামকে চাকরি দেওয়ার জন্য সরাসরি তদবির করেছিলেন। কিন্তু নিয়োগ বোর্ডের সামনে জহিরুল ইসলামের লিখিত পরীক্ষার খাতার সঙ্গে হাতের লেখা এবং মেধার চরম অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে, জহির নিজে পরীক্ষা না দিয়ে সাখাওয়াত নামের এক প্রক্সি পরীক্ষার্থীকে দিয়ে লিখিত পরীক্ষা দেওয়ান। জালিয়াতি ও প্রতারণার এই ঘটনা হাতেনাতে ধরা পড়ার পর জেলা প্রশাসক বিন্দুমাত্র আপস না করে প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেন এবং তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালী সদর থানায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের ব্যক্তিগত সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটর রাকিবুল ইসলাম বাদী হয়ে এ বিষয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়, লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া জহিরুল ইসলামকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হলে ভাইভা বোর্ডের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতেও তিনি ব্যর্থ হন। সন্দেহ তৈরি হওয়ায় বোর্ডের সদস্যরা তার লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র এবং হাতের লেখা পরীক্ষা করে স্পষ্ট ভিন্নতা পান। কড়া জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে জহির স্বীকার করেন যে, ২৫ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালী সরকারি কলেজের বাণিজ্য ভবনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় চুক্তি অনুযায়ী সাখাওয়াত নামের ওই ব্যক্তি তার স্থান নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিলেন। সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পরপরই জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশে দেওয়া হয়।
নিয়োগ বোর্ডে অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় ক্ষুব্ধ হন প্রতিমন্ত্রী। কার্যালয়ের একাধিক কর্মচারীর সূত্রে জানা গেছে, পছন্দের লোককে নিয়োগ না দিয়ে উল্টো থানায় সোপর্দ করায় প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। এর পরেই তিনি সরকারের নীতি নির্ধারণী ও ঊর্ধ্বতন মহলে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে তাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন। একজন প্রক্সি পরীক্ষার্থী ও অনিয়মে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে সাফাই গেয়ে প্রশাসনকে চাপ দেওয়ার এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
তদবির না শোনার কারণে জেলা প্রশাসককে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর অনৈতিক চাপের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে তিনি জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে আচরণগত সমস্যার অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, জেলা প্রশাসক প্রটোকল মানতেন না এবং ঊর্ধ্বতনদের সম্মান করতেন না। তিনি পটুয়াখালী সফরে গেলে জেলা প্রশাসক তার কোনো সরকারি বা সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতেন না, যেখানে জেলা পুলিশ সুপার নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন। এমনকি কুয়াকাটার একটি বেসরকারি সেমিনারের অজুহাতে জেলা প্রশাসক প্রতিমন্ত্রীর সরকারি সফরকালে অনুপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। এসব অসদাচরণের কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেন। তবে পিয়ন নিয়োগে অনৈতিক প্রভাব খাটানোর বিষয়টি তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
অন্যদিতে পুরো ঘটনাকে পদোন্নতিজনিত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে ধামাচাপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ। তিনি জানান, ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীর পদোন্নতি হওয়ায় এই বদলি সম্পূর্ণ রুটিন ওয়ার্ক এবং এর পেছনে প্রতিমন্ত্রীর কোনো হাত আছে কি না তা তার জানা নেই। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দেওয়া ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীর কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি পুরো বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সরকারি প্রশাসনে একজন জনপ্রতিনিধির এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সুশাসনের গবেষকরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিষয়টিকে অত্যন্ত অগ্রহণযোগ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, একই সাথে একাধিক জেলা প্রশাসকের বদলি হওয়ায় ওপর দিয়ে এটিকে রুটিন কাজ মনে হলেও, একজন অপরাধী ও প্রতারকের পক্ষ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তার ওপর অনৈতিক চাপ তৈরি করা সম্পূর্ণ অবৈধ। নীতি ও আইনি অবস্থান ধরে রাখার কারণে কোনো কর্মকর্তাকে যদি প্রশাসনিক ব্যবস্থার নামে শাস্তি হিসেবে বদলি করা হয়, তবে তা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী নীতি, শুভ বুদ্ধি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839