আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিতর্কিত ভূমিকায় চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে পুলিশের হাইকমান্ড। মাঠপর্যায়ে আস্থা ও ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে বাহিনীর ৬,৫৩৯ জন পরিদর্শকের বিষয়ে এক নজিরবিহীন গোপন তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। উদ্দেশ্য একটাই, অসাধু ও বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে পেশাদার, দক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা।
বিতর্কিত কর্মকর্তাদের কারণে পুরো বাহিনীর অর্জিত সুনাম যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন থানায় দায়িত্বরত কয়েকজন কর্মকর্তার অনৈতিক আচরণ, দায়িত্বে অবহেলা এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার খবর প্রকাশ পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে নানামুখী আলোচনা ও ক্ষোভ। এই অচলাবস্থা দূর করতে এবং মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট শাখা থেকে একটি বিশেষ নির্দেশনা দেশের সব পুলিশ ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। এতে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতিটি পরিদর্শকের পেশাগত ও ব্যক্তিগত তথ্যের একটি সার্বিক প্রোফাইল তৈরি করতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত অনলাইন ফরমে পরিদর্শকদের চাকরি জীবনের অর্জন, পূর্বতন কর্মস্থল, অতীতে পাওয়া শাস্তির বিবরণ এবং বর্তমান কর্মকাণ্ডের নিখুঁত হিসাব চাওয়া হয়েছে। পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২ শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির স্বাক্ষরিত এই চিঠির পর থেকেই পুরো বাহিনীতে এক ধরনের প্রশাসনিক সতর্কতা বিরাজ করছে।
পুলিশের প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিদর্শক পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সারাদেশে অনুমোদিত ৬,৯৫৭টি পরিদর্শক পদের বিপরীতে সক্রিয় আছেন ৬,৫৩৯ জন কর্মকর্তা। এর মধ্যে সশস্ত্র, নিরস্ত্র ও টেকনিক্যাল বিভিন্ন শাখায় এই কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। থানা পর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, মামলা তদন্ত এবং সরাসরি জনগণের মুখোমুখি হওয়ার মতো সংবেদনশীল কাজগুলোর নেতৃত্ব দেন তারাই। ফলে তাদের যেকোনো নীতিগত স্খলন গোটা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে সরাসরি ক্ষুণ্ণ করে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর একাধিক থানার পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নানা অনিয়মের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। কোথাও অপরাধে অভিযুক্তদের সঙ্গে গোপন অনৈতিক যোগাযোগ, কোথাও সহিংস ঘটনা রোধে ব্যর্থতা, আবার কোথাও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অন্যায় সুবিধা নেওয়ার সুস্পষ্ট অভিযোগ উঠেছে। এমনকি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক আনুগত্য দেখানোর মতো গুরুতর অভিযোগও উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের ইতিমধ্যে প্রত্যাহার ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও হাইকমান্ড মনে করছে, শুধু লোকদেখানো প্রত্যাহার সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
এমন পরিস্থিতিতে প্রতি মাসের মতো অনুষ্ঠিত অপরাধ পর্যালোচনা সভায় নীতিনির্ধারকরা প্রকাশ্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তদবির বা কোনো অযৌক্তিক সুবিধার ভিত্তিতে আর কাউকে থানার দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। বরং কঠোর যাচাই-বাছাই ও সৎ মনোভাবাপন্ন কর্মকর্তাদের বাছাই করে পদায়ন করাই এখন সময়ের দাবি।
পুলিশে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ‘ফিটলিস্ট’ বা যোগ্যতা নির্ধারণী কঠোর নীতিমালা রয়েছে। নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, কোনো কর্মকর্তা যদি চাকরি জীবনে অনৈতিক আচরণ বা অনিয়মের কারণে একটিও গুরুতর শাস্তি পেয়ে থাকেন, তবে তিনি এই পদের জন্য একেবারেই অযোগ্য বিবেচিত হবেন। এ ছাড়া বয়সসীমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ন্যূনতম চাকরির মেয়াদ এবং মূল্যায়নে নির্দিষ্ট নম্বর পাওয়ার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রশাসনিক শৃঙ্খলা যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগ ছিল। বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত লবিংয়ের মাধ্যমে যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর কারণেই আজকের এই সংঙ্কট তৈরি হয়েছে।
তদন্ত প্রক্রিয়া ও পরিবর্তন আনার এই প্রচেষ্টা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে দাপ্তরিক গোপনীয় বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন। তবে সাবেক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, শুধু তথ্য সংগ্রহের এই চেনা পথে গিয়ে কিংবা গোপন তদন্ত চালিয়ে সার্বিক পরিবেশ পরিবর্তন করা কঠিন হবে। তাদের মতে, আসল সমাধান নিহিত রয়েছে প্রতিষ্ঠিত নীতিমালাগুলোর শতভাগ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগের মধ্যে। নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ও যোগ্যতাভিত্তিক পদায়ন নিশ্চিত না করা গেলে সাময়িক রদবদল হয়তো আসবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক সুস্থতা ফিরে পাওয়া কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে, পুলিশ প্রশাসন এখন নিজেদের ভেতরের অনিয়ম দূর করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সাধারণ মানুষ চায় থানাগুলো যেন কোনো ভয় বা প্রভাবের জায়গা না হয়ে ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয়ে পরিণত হয়।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839