আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জহাট হাই স্কুল মাঠে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো আদিবাসীদের কৃষ্টি কালচার ও জীবনমান নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলন মেলা। নামকরণে আদিবাসী হলেও দীর্ঘদিন থেকে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সবাই এ মেলায় বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে অংশগ্রহণ করে আসছেন। আদিবাসী মিলন মেলার আগমন বার্তা এ অঞ্চলের মানুষের দিনক্ষণ তথা প্রহর গণনার পালা হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে সবাই অপেক্ষা করতে থাকে কবে কখন আসবে আনন্দঘন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
মেলায় আদিবাসী তরুণ-তরুণী, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাদের সাথে একাকার হয়ে যায় এই অঞ্চলের সব ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ও পেশার মানুষ। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আদিবাসী মূলত সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ, যাদের আদি যুগে জীবনযাত্রার মান ছিল ভিন্ন প্রকৃতির এবং সামাজিক ভাবে অনেকটাই নিম্ন পর্যায়ে চলাফেরা করত। সেসময়ে তারা কোনো পড়াশোনা করত না এবং একেবারেই অশিক্ষিত অবস্থায় বন-জঙ্গলে কচু-ঘেচু ও পশুপাখি শিকার করত, সামাজিক ভাবেও তারা ছিল মারাত্মক অসচেতন। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আদিবাসীরা এখন অনেকটাই সামাজিক চেতনায় শিক্ষিত এবং উচ্চ শিক্ষিত হয়ে সভ্য যুগের অত্যাধুনিক পরিবেশে বসবাস শুরু করেছে।
তাই তাদের কতিপয় স্বল্প সংখ্যক তরুণ-তরুণী মান্ধাতা আমলের তথা আদি যুগে প্রতিষ্ঠিত আদিবাসী মিলন মেলার প্রথাকে পরিবর্তন করতে চান, যার অন্যতম উদাহরণ রিতা হেমরম যিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তাদের অনুভূতির প্রকাশ করেছেন। তিনি এ মেলার নাম বিগত সময় বাসিয়া হাটি, বৌ মেলা বা জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা প্রচার করায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এটিকে আদিবাসী মিলন মেলা হিসেবে প্রচার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজা বিসর্জনের পর বাসিয়া হাটির দিন গোলাপগঞ্জহাটে এই ঐতিহাসিক আদিবাসী মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এবারও মহা ধুমধামে অনুষ্ঠিত হলো এই মেলা। মেলাটি সফল করার লক্ষ্যে ইতোপূর্বে প্রস্তুতি সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দিকনির্দেশনা মূলক বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু।
আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির আহ্বায়ক জোসেফ হেমরমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আদিবাসী মিলন মেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমা খাতুন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির উপদেষ্টা, দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক, সাবেক ভিপি ও ইটভাটা মালিক সমিতি সভাপতি রেজওয়ানুল ইসলাম রিজু। এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম, নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান আনিস, মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শাহীনুর রহমান চৌধুরী শাহীন।
আরও উপস্থিত ছিলেন পৌর বিএনপির সভাপতি আমিরুল বাহার, সাধারণ সম্পাদক নমিরুল ইসলাম চৌধুরী সেনা, মরিচা ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি ফশিউর রহমান চৌধুরী নবাব, সম্পাদক ও চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী প্রধান শিক্ষক আব্দুল কাদের, একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বী যুবদলের সদস্য সচিব তানভীর চৌধুরী। পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সুজালপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শওকত জুলিয়াস জুয়েল, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ শিপন এবং আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির উপদেষ্টা মহিদাস মার্ডি।
আয়োজকদের বর্ণনা মতে জানা গেছে, এবারের মেলায় চার শতাধিক বিবাহযোগ্য যুগলকে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে পারিবারিক আলোচনা সাপেক্ষে তাদের বিবাহ সম্পন্ন করা হবে। মেলায় গুড়ের জিলাপি, শিশু বিনোদন ও খেলনা বিক্রির দোকানসহ বিভিন্ন পণ্যের বাহারী দোকান বসেছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সন্ধ্যা সাত ঘটিকা পর্যন্ত মেলা চলমান রয়েছে এবং মেলাস্থলে তিল পরিমাণ জায়গা না পেয়ে নারী-পুরুষ ও তরুণ-তরুণীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
এলাকার ঐতিহ্যবাহী এবং স্মরণকালের মনোমুগ্ধকর আদিবাসীদের কৃষ্টি কালচার নিয়ে অনুষ্ঠিত এই মিলন মেলায় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ধনির উদ্দিন, মরিচা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি রশিদুল ইসলাম, আদিবাসী নেতা পাথরাজ, শীতল মার্ডি, বাজুন বেসরা, দুলাল হেমরমসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার স্থানীয় অগণিত অসংখ্য মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839