আই জামান চমক, icrbd24: বর্ষার শেষে করতোয়ার পাড়ে দাঁড়ালে একটা অদ্ভুত শান্তি টের পাওয়া যায়। ওপরে ধূসর আকাশ, নিচে ঘোলা জল, আর দূরে হিমালয়ের দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস। নদী কখনো গর্জন করে না। সে বয়ে যায়, আর যেখানে যায় সেখানে মাটি সবুজ হয়। পাথরাজ নদীর পাড়ের কৃষকেরা এটা জানে। যে নদী চুপচাপ বয়, সেই নদীই ফসল ফলায়। আর যে নদী শুধু শব্দ করে, সে হয় ভাঙনের নদী।
মানুষ নিয়ে ভাবতে গেলে আমার প্রায়ই নদীর কথা মনে পড়ে।
মন্ত্রী হয়েও তিনি মন্ত্রী নন। মন্ত্রী মানেই আলাদা একটা গুরুগম্ভীর ব্যাপার। অন্য রকম ভাবসাব। সবাই তোষামোদ করবে আর মন্ত্রী শুধু ঘাড় নাড়বেন। বড়জোর ক্যামেরার সামনে দুই একটা মুখস্থ কথা বলবেন। ধোপদুরস্ত পোশাক, সামনে পেছনে সরকারি বেসরকারি রক্ষীদের প্রটোকল, সব মিলিয়ে একটা এলাহি কারবার। হুমায়ূন আহমেদের একটি নাটকে সংলাপ ছিল, “মন্ত্রী কি জিনিস বোঝো মিয়া?” হিমালয়কন্যার এই জনপদের মানুষও মন্ত্রী বলতে সেটাই বুঝত, যা বরাবর সবাই বুঝে এসেছে। সাধারণ মানুষের কাছে মন্ত্রী এমপি মানে অনেক দূর থেকে এক নজর দেখা, আর বুঝে না বুঝে হাততালি দেওয়া।
এই ধারণাটা বদলে দিয়েছেন বোদা দেবীগঞ্জের এমপি এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। তিনি চলেন আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই। যেন ওই মানুষদেরই একজন। কথা কম বলেন, কাজ বেশি করেন। আর যখন বলেন, একদম সোজাসাপটা।
পেশার কারণে আমি অনেক মন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখেছি। একটা জিনিস বারবার চোখে পড়েছে। ক্ষমতার চেয়ারে বসলে মানুষ বদলায়। প্রথমে হয়তো খুব ধীরে, নিজেও টের পায় না। তারপর একদিন দেখা যায় তার চারপাশে একটা অদৃশ্য দেওয়াল উঠে গেছে। সেই দেওয়ালের এপারে সে, আর ওপারে যাদের ভোটে সে এসেছিল।
আব্রাহাম লিংকনের নামে একটা কথা চলে, আর কথাটা আমি ভুলতে পারি না। বিপদে অনেকেই টিকে থাকতে পারে, কিন্তু কারও চরিত্র যাচাই করতে চাইলে তার হাতে ক্ষমতা দিয়ে দেখো। কথাটা লিংকনের কি না, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের তর্ক আছে। কিন্তু কথাটা যে সত্য, তা নিয়ে আমাদের কারও তর্ক নেই। আমরা সবাই দেখেছি, চোখের সামনে দেখেছি। দারিদ্র্যে যিনি সৎ ছিলেন, গদি পেয়ে তিনি কীভাবে বদলে গেলেন।
ফরহাদ হোসেন আজাদও বদলেছেন, কিন্তু উল্টো পথে। নির্বাচনের আগে তবু একটু আলাদা ছিলেন। মন্ত্রী হওয়ার পর হয়ে গেছেন আরও সাধারণ। ব্যাপারটা শুনতে বিপরীত মনে হয়, কিন্তু এটাই সত্য।
আমার মনে হয়, এর কারণ আছে। যে মানুষ মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এসেছেন, ক্ষমতার চাকচিক্য তাকে সহজে ভোলাতে পারে না। যিনি বারবার বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে ন্যায়ের কথা বলেছেন, তিনি জানেন গদি আসে আর যায়, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস একবার গেলে আর ফেরে না। অনাচারের বিরুদ্ধে যিনি ছিলেন আগুন, ক্ষমতা পেয়ে তিনি হয়েছেন পানি। এটা তাঁর সঙ্গেই মানায়। আর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বটাও যেন কাকতালীয় নয়। আগুন যা পুড়িয়ে দেয়, পানি তা আবার বাঁচিয়ে তোলে।
তাই তিনি করতোয়া আর পাথরাজের মতো বয়ে চলেছেন নিজের মতো। কারও মন রাখতে নয়, কারও ভয়েও নয়। তাঁর চোখে স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখছে এই জনপদের মানুষ। নদীর পাড়ের মানুষ বক্তৃতায় ভোলে না। সে দেখে বাঁধ টিকল কি না, খাল কাটা হলো কি না, বর্ষায় বাড়ি ভাসল কি না। কাজ দিয়েই সে মাপে মানুষকে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে, সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে।” ক্ষমতার রাজনীতিতে এই শৈবাল আসে নানা চেহারায়। কখনো তোষামোদকারী হয়ে, কখনো সুবিধাভোগী হয়ে, কখনো নরম গলায় মিথ্যে বলা পারিষদ হয়ে। যে নেতা স্রোত হারান, তাকে এরাই ঘিরে ধরে। আমার প্রার্থনা, ফরহাদ হোসেন আজাদের স্রোত যেন কখনো না থামে।
তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, দৃঢ় হুঁশিয়ারি আর কোমল ভালোবাসা দেখলে আমার ছেলেবেলার প্রজাপতি প্রকাশনীর মাসুদ রানা সিরিজের কথা মনে পড়ে। সেই চিরতরুণ নায়ক, যে অন্যায় দেখলে চুপ থাকে না, আবার দুর্বলের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করে না। তফাত শুধু একটাই। মাসুদ রানা থাকেন বইয়ের পাতায়, পর্দার আড়ালে। আমাদের এই নায়ক পর্দায় নন, বাস্তবে আছেন। হাঁটেন আমাদের সঙ্গে। চলেন আমাদের পাশে।
প্রশ্ন একটাই থেকে যায়। এমন মানুষ কি আমরা ধরে রাখতে পারব? ক্ষমতার ভেতরে সৎ থাকা কঠিন, কিন্তু সৎ মানুষকে সৎ থাকতে দেওয়াও কম কঠিন নয়। চারপাশের মানুষ যদি তোষামোদ না করে সত্য বলে, যদি প্রশংসার বদলে প্রশ্ন করে, তবেই নদী তার স্রোত ধরে রাখে। নইলে ধীরে ধীরে সেও শৈবালে ঢেকে যায়।
আমরা যেন সেই শৈবাল না হই। আমরা যেন হই নদীর পাড়, যে পাড় নদীকে পথ দেখায়, বাধা দেয় না। আর এই জনপদের মানুষ যেন মনে রাখে, মন্ত্রী হয়েও যিনি মন্ত্রী নন, তিনি আমাদের দেওয়া আমানত। এই আমানতের মর্যাদা রাখা আমাদেরও দায়িত্ব।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839