আই জামান চমক, icrbd24: তিতাস নদীর কাছে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে তার শান্ত ভাবটা। পদ্মার মতো গর্জন নেই, মেঘনার মতো দাপট নেই। অথচ অদ্বৈত মল্লবর্মণ যখন লিখলেন “তিতাস একটি নদীর নাম”, তখন বাংলা সাহিত্য বুঝে গিয়েছিল, নীরব নদীরও বুকে মহাকাব্য থাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসুদেব ইউনিয়নের ঘাটিয়ারা গ্রামে সেই তিতাসের পাড়ে দাঁড়ালে মনে হয়, মাটি এখানে কথা বলে, তবে ফিসফিস করে। যে কান পাততে জানে, সে শুনতে পায়।
ঘাটিয়ারার মোল্লাবাড়ির সেই মাটি থেকেই উঠে এসেছেন এবিএম সোহেল রশিদ। যদিও জন্ম তাঁর ঢাকায়, ১৯৬৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর, আজিমপুরের মেটারনিটি হাসপাতালে। শহরে জন্ম, শহরে বেড়ে ওঠা, অথচ শিকড়টা নদীর পাড়েই রয়ে গেছে। একটা গাছকে কত দূরেই বা সরিয়ে নেওয়া যায়? ডালপালা আকাশে ছড়ালেও সে তো মাটির কথা ভোলে না।
আগামী ২৩ ডিসেম্বর তাঁর জন্মদিন। কবি, কথাসাহিত্যিক, অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার, সাংবাদিক, সংগঠক। আমাদের দেশে তো পরিচয়ের অভাব নেই, ভারটাই বেশি। কিন্তু সোহেল রশিদের বেলায় ব্যাপারটা আলাদা। শিল্প আর সংস্কৃতির প্রায় প্রতিটি পথে তিনি হেঁটেছেন স্বচ্ছন্দে, যেন নিজের উঠোনে হাঁটছেন। এই স্বাচ্ছন্দ্য ভান করে আসে না। আসে দীর্ঘ চর্চা থেকে, দীর্ঘ ভালোবাসা থেকে।
একটা কথা না বললে লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর বাবা এবিএম আবদুর রহীম ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকৃত শহীদ বুদ্ধিজীবী। মা মিসেস ঝরনা রহীম ছিলেন কারুশিল্পী। একজন দিয়ে গেছেন প্রাণ, আরেকজন হাতের কাজে সৌন্দর্য। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় যিনি, তাঁর কাঁধে ছোটবেলা থেকেই একটা অদৃশ্য ভার থাকার কথা। বাবাহারা সংসারে বড় সন্তান কখনো পুরোপুরি শিশু থাকতে পারে না। সেই ভারটাই কি তাঁর লেখায় গভীরতা এনেছে? আমি ঠিক জানি না। তবে এটুকু জানি, কষ্ট যাকে গড়ে, সে সহজে ভাঙে না।
মধ্যবিত্তের টানাপোড়েনের ঢাকায় বড় হয়েছেন বলেই তাঁর কবিতায় নগরের যন্ত্রণা এসেছে, তার গৌরব আর সৌকর্য নিয়ে। প্রেম এসেছে, বিচ্ছেদ এসেছে, বিরহ এসেছে ছয় ঋতুর মতো, প্রতিবার নতুন রঙে। সময়ের নদীর স্রোতে বিরহও যে রঙ বদলায়, এই সত্য সবাই লিখতে পারে না। লিখতে হলে নিজের ভেতরের নদীটাকে দেখতে হয়। তাঁর কবিতার বইগুলোর নামেই একটা গন্ধ আছে। “পাপড়িতে মাখামাখি বিকেলের রোদ”, “আগুন ঠোঁটের ঘ্রাণ”, “বিসর্জনের অহংকার”, “সারথিকে আমি চিনি”, “মায়াবী জালে বাঁধা উঠোন”। নামগুলো পড়লে মনে হয়, কেউ যেন উঠোনে বসে বিকেলের রোদ গায়ে মেখে বহুদিনের কথা বলছেন।
তিন দশক ধরে লিখছেন তিনি, ছাপার কাগজে, পর্দার আলোয়, নানা মাধ্যমে। তিরিশ বছর কম সময় নয়। এই সময়ে কত কবি এল, কত কবি হারিয়ে গেল। কেউ থেমে গেল অভিমানে, কেউ বিক্রি হয়ে গেল সুবিধার দরে। টিকে থাকাটাই তো এ দেশে একটা বড় সাহসের কাজ। বিশেষ করে যখন লেখাকে পেশা নয়, ভালোবাসা মনে করে কেউ পথ চলে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।” সুন্দরকে যে ভালোবাসে, সে বাঁচতে চায়, বাঁচাতেও চায়। শিল্পীর সবচেয়ে বড় প্রার্থনা বোধহয় এটাই, আরেকটু বাঁচি, আরেকটা কবিতা লিখি।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন সংস্কৃতির মানুষকে অনেক সময় শুধু অনুষ্ঠানের অতিথি করে রাখা হয়। মঞ্চে ডাকা হয়, ফুল দেওয়া হয়, ছবি তোলা হয়, তারপর সবাই যে যার ঘরে। অথচ একটা জাতির ভেতরের আলো জ্বালিয়ে রাখেন এই মানুষেরাই। সংগঠক হিসেবে, লেখক হিসেবে, অভিনেতা হিসেবে। যে সমাজ তার কবিকে ভুলে যায়, সে সমাজ একদিন নিজের ভাষাও ভুলে যায়। এ কথা কি আমরা মনে রাখি?
নজরুল বলেছিলেন, “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান।” একই বৃন্তে ফোটা ফুলের মতোই শিল্পের সব শাখা, কবিতা, অভিনয়, কথাসাহিত্য, চিত্রনাট্য, একই শিকড় থেকে রস টানে। সোহেল রশিদ সেটা বুঝেছেন বলেই কোনো একটা ঘরে নিজেকে আটকে রাখেননি। এই খোলা মনটাই আজকাল সবচেয়ে দুর্লভ।
জন্মদিন আসলে একটা বাঁক। নদী যেমন বাঁক নেওয়ার সময় একবার পেছনে তাকায়, মানুষও তাকায়। কী পেলাম, কী হারালাম, কতটা পথ বাকি। আমি চাই, এবারের বাঁকে দাঁড়িয়ে তিনি দেখুন, তাঁর জন্য অনেকে অপেক্ষা করে আছে। যাঁরা তাঁর কবিতা পড়ে একটু থেমেছেন, তাঁর অভিনয় দেখে নিজের কথা ভেবেছেন, তাঁর সংগঠনের ছায়ায় এসে সাহস পেয়েছেন।
আমার পিতা, সোহেল ভাই, জন্মদিন আসুক বারবার, বাবা ডাকতে চাই বারবার। অনেক অনেক বার। শরীরটা ভালো থাকুক, কলমটা চলুক, তিতাসের মতো শান্ত অথচ গভীর থাকুক আপনার প্রতিটি উচ্চারণ। আমাদের দেশে আপনার মতো মানুষের বড় প্রয়োজন।
আর আমরা যারা পাঠক, যারা সহযাত্রী, আসুন একটা কাজ করি। বেঁচে থাকতেই মানুষকে ভালোবাসার কথাটা বলি। মৃত্যুর পর স্মরণসভায় নয়, জন্মদিনের সকালে, একটা ফোনে, একটা বার্তায়। কবি অপেক্ষা করেন না, তবু কবির ভালো লাগে।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839।