• শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম
মন্ত্রী হয়েও যিনি মন্ত্রী নন: ফরহাদ হোসেন আজাদ শরীফ আহমেদ: বুড়ি তিস্তার পারের ছেলেটি যখন সময়কে অতিক্রম করে ডোমারে জামায়াতে ইসলামী যুব বিভাগের উদ্যোগে ঐতিহাসিক ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত ডোমারে হোন্ডা শাহিন উৎসব ও জোড়াবাড়ীতে ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত শুভ জন্মদিন: এবিএম সোহেল রশিদ গঙ্গাচড়ার বেতগাড়ীতে উম্মুক্ত লটারিতে ১০ নারী কর্মী নিয়োগ, দায়িত্ব পালন করবেন ৫ বছর দিনাজপুরের বীরগঞ্জে পল্লী চিকিৎসককে পথরোধ করে মারপিট ও অপহরনের চেষ্টা, থানায় লিখিত অভিযোগ নীলফামারীর জলঢাকার চাঞ্চল্যকর প্রাণহানি মামলার চার আসামিকে ঢাকায় গ্রেপ্তার করল এসআরবি নারী কর্মী নিয়োগের লটারি বিতর্কের জেরে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় প্রকৌশলী স্ট্যান্ড রিলিজ রংপুর সিটি প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি গঠন: পুনরায় সভাপতি স্বপন চৌধুরী ও সম্পাদক হুমায়ুন কবীর মানিক

শরীফ আহমেদ: বুড়ি তিস্তার পারের ছেলেটি যখন সময়কে অতিক্রম করে

সংবাদদাতা:
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬

আই জামান চমক, icrbd24: বর্ষা শেষে বুড়ি তিস্তার জল যখন নেমে যায়, পলির গায়ে নতুন ঘাস ওঠে। আমি দেখেছি, সেই ঘাস কেউ রোপণ করে না, মাটির ভেতরের জোরেই সে মাথা তোলে। কিছু মানুষও এমন। কেউ তাদের গড়ে দেয় না, ভেতরের তাগিদেই তারা জেগে ওঠে।

শরীফ আহমেদ আমার ভাগ্নে। আগেই বলে রাখি, যাতে পাঠক জেনে নিয়েই আমার কথা বিচার করেন। আত্মীয়ের প্রশংসা করতে বসে লেখক যে একটু ঝুঁকে পড়েন, সে কথা আমি জানি। তবু ভেবে দেখলাম, চেনা মানুষের কথাই তো সবচেয়ে সৎভাবে বলা যায়। যাকে ছোটবেলা থেকে দেখেছি, তার সম্পর্কে অন্তত অনুমানের ওপর ভর করে লিখতে হয় না।

শৈশব থেকেই ছেলেটা একটু অন্যরকম। ডানপিটে, ছটফটে। পাড়ার খেলার মাঠে কিংবা স্কুলের সহপাঠীদের দলে, যেখানেই থাকত, কেমন করে যেন সবাই তাকে সামনে ঠেলে দিত। কেউ ঠিক করে বলে দিত না, সে-ই নেতা। অথচ পথ অচেনা হলে সবার চোখ গিয়ে পড়ত তার দিকেই। সামনে একজন থাকলে বাকিরা নিশ্চিন্ত হয়। এই নিশ্চিন্ত করার ক্ষমতাটা শেখানো যায় না। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।” শরীফের মধ্যে আমি সেই একলা চলার সাহস দেখেছি, আবার দেখেছি, তার ডাকে লোক জড়ো হয়ে যাওয়ার সহজ স্বভাবও।

কৈশোরেই সে শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শের কাছে নিজেকে সঁপে দিল। জাতীয়তাবাদের পতাকা কাঁধে নিয়ে সে নির্ভয়ে লিখল শাসকগোষ্ঠীর অনাচারের কথা। নেতা হিসেবে পেল ফরহাদ হোসেন আজাদকে। একজন নেতার যোগ্য কর্মী হতে হলে কী লাগে, তার কাজ বারবার সেটা দেখিয়েছে। রাজনীতির মাঠে খোলা পিঠে দাঁড়ানোর মতো সাহস সবার থাকে না। আর কিশোর বয়সে থাকলে তার দাম আরও বেশি, কারণ তখন হারানোর ভয়ের চেয়ে পাওয়ার স্বপ্নটাই বড় থাকে। তবু যে সেই স্বপ্নকে সে বয়ে নিয়ে এসেছে এতদূর, সেটাই কম কথা নয়।

ছেলেটা বিনয়ী, ভদ্র, কথায় নরম। কিন্তু অন্যায়ের সামনে দাঁড়ালে তার গলা বদলে যায়। তখন মনে হয়, কণ্ঠ থেকে যেন আগুন ঝরছে। একই মানুষের মধ্যে এই দুই রূপ থাকা বিরল। যারা শুধু নরম, তারা অন্যায়ের সামনে চুপ করে যায়। যারা শুধু কড়া, তারা ক্ষমতা পেলে অহংকারী হয়ে ওঠে। দুটোর ভারসাম্য যার আছে, তার ওপর ভরসা করা চলে।

এবার একটা ব্যক্তিগত কথা বলি। কিছুদিন আগে আমার বাইকটা হারিয়ে গেল। যাদের বাইক একবার হারিয়েছে, তারা জানেন সেই দুশ্চিন্তা কেমন। ঘুম আসে না, খাওয়ায় রুচি থাকে না, মন বারবার ফিরে যায় সেই জায়গাটায় যেখানে শেষবার রেখেছিলাম। পুলিশের কাছে গেলাম। তারা চেষ্টা করল, কিন্তু কোনো হদিস পেল না। দিন যত যায়, আশা তত পাতলা হয়ে আসে। তখন একটা সূত্র আমার হাতে এল। ছোট্ট একটা ক্লু, তাতে ভরসা করার মতো কিছু নেই। সেটা আমি শরীফকে দিলাম। দিয়ে ভাবলাম, ব্যস্ত ছেলে, নিজের হাজারটা কাজ, কতটুকুই বা করবে।

ভুল ভেবেছিলাম। সে সব কাজ ফেলে রেখে ওই সূত্র ধরে নেমে পড়ল। কাউকে দিয়ে খোঁজ নিয়ে ক্ষান্ত হলো না, নিজেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল। যেখানে যেতে হয় গেল, যার সঙ্গে কথা বলতে হয় বলল, তার সাধ্যের সবটুকু উজাড় করে দিল। আমি তাকে এ কাজের জন্য বলিনি, বলার অধিকারও ছিল না। সে করেছে কারণ কারও বিপদে দূর থেকে সহানুভূতি জানানো তার স্বভাবে নেই। বাইক ফিরল কি ফিরল না, সেটা এখানে বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, পুলিশ যেখানে থেমে গিয়েছিল, একটা তরুণ সেখান থেকে শুরু করেছিল।

সেদিন আমার মনে হয়েছিল, এই ছেলেটা আসলে কী করতে চায় আর কী করতে পারবে, তার উত্তর আমি পেয়ে গেছি। যে মানুষ আত্মীয়ের একটা বাইকের জন্য এভাবে ছোটে, সে একটা ইউনিয়নের মানুষের জন্য কতদূর ছুটবে, তা আন্দাজ করা কঠিন নয়। বিপদে পড়লে বন্ধু চেনা যায়, আমাদের গ্রামের এই পুরোনো কথাটা মিথ্যে নয়। আমি শুধু যোগ করব, বিপদে ভবিষ্যৎ নেতাকেও চেনা যায়।

আর এমন টুকরো টুকরো ঘটনা তো একা আমার নয়। এই এলাকার অনেক মানুষের সঙ্গেই শরীফের এমন স্মৃতি জমে আছে। কারও রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার রাতে, কারও ঘর ভাঙার দিনে, কারও মাথার ওপর ছাদ না থাকার সময়ে সে এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। যে মানুষগুলোর পাশে সে ছিল, তারা নিশ্চয়ই তাকে ভুলবে না। ভালোবাসার ঋণ মানুষ সহজে ভোলে না, সময় এলে সেটা শোধ করে দেয়।

টেপ্রীগঞ্জের মাটিতে এখন তার জনপ্রিয়তা বেশ উঁচুতে। তরুণ প্রজন্মের প্রিয় মুখ হয়ে ওঠা সহজ কথা নয়। আর নারীসমাজের আস্থা অর্জন করা তো আরও কঠিন, কারণ সেখানে ভাষণ দিয়ে কাজ হয় না, আচরণ দিয়ে জিততে হয়। বেশ কয়েক মাস ধরে আমি চুপচাপ লক্ষ করছি। আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগেই মানুষের মনে তার জন্য একটা জায়গা তৈরি হয়ে গেছে। এটা কারও বানিয়ে দেওয়া হিসাব নয়, হাটে মাঠে চায়ের দোকানে কান পাতলেই টের পাওয়া যায়।

তরুণরা বলছে, শরীফ চেয়ারম্যান হলে ইউনিয়নটা আধুনিক হতে পারে, প্রযুক্তির সুবিধা গ্রামের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারে। কথাটা শুনে আমার ভালো লাগে। আমাদের গ্রাম যুগ যুগ ধরে শুনে এসেছে, শহর এগোবে, গ্রাম পরে। কেন পরে? বুড়ি তিস্তার ওপারের ছেলেটাও তো একই আকাশের নিচে বড় হচ্ছে।

এখানে একটা কথা না বললে লেখাটা অসৎ হবে। জনপ্রিয়তা আর দায়িত্ব এক জিনিস নয়। ভালোবাসা পাওয়া সহজ, তার মর্যাদা রাখা কঠিন। মানুষ আজ যতটা আশা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে, কাল সেই আশা ভাঙলে আঘাতও ততটাই গভীর হবে। শরীফকে সেটা মনে রাখতে হবে। আরিস্টটল বলেছিলেন, মানুষ স্বভাবতই রাজনৈতিক প্রাণী। অর্থাৎ সমাজের সঙ্গে বাঁধা থাকাই তার নিয়তি। যে সেই বাঁধনকে সেবার সুযোগ ভাবে, সে-ই টিকে থাকে। যে ভাবে ক্ষমতার সিঁড়ি, সে একদিন হোঁচট খায়।

ভোটের ফল কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে। আমি গণক নই। গণনার মাঠে ওলটপালট হয়, তা আমরা সবাই দেখেছি। তবু একটা কথা জোর দিয়ে বলতে পারি। টেপ্রীগঞ্জের তরুণদের মুখপাত্র হিসেবে শরীফকে মেনে নিতেই হবে। মানুষ তাকে সহজে গ্রহণ করছে, আর এই সহজ গ্রহণটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় আশার খবর। কারণ জোর করে চাপিয়ে দেওয়া নেতৃত্বের আয়ু কম। মানুষ যাকে নিজে থেকে বুকে টেনে নেয়, তার শিকড় থাকে গভীরে।

কুরুম নদী অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করে আছে, এমন একজনের জন্য যে এই মাটির কান্না বুঝবে। বুড়ি তিস্তা সব সয়ে নীরবে বয়ে চলেছে, কোনো অভিযোগ না করে। নদী তো জানে, একদিন না একদিন ঠিক মানুষটি আসে।

শরীফকে আমি স্নেহ করি, ভালোবাসি। সে চেয়ারম্যান হলে ব্যক্তিগতভাবে আমি খুশি হব, এ কথা লুকোতে চাই না। তার মানবিক কাজ আর এই পথচলার জন্য রইল আমার শুভকামনা। আর পাঠক, আপনার কাছে একটাই প্রশ্ন। আপনার ইউনিয়নের নতুন প্রজন্ম যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, আপনি কি তাকে জায়গা করে দেন, নাকি দূর থেকে সন্দেহের চোখে দেখেন?

লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839


এরকম আরও সংবাদ