• শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১০ অপরাহ্ন
শিরোনাম
করতোয়ার পাড়ে থেমে গেল একটি কণ্ঠ: ওপারে ভালো থাকুন জগেশ দা গঙ্গাচড়ায় রি.কে.এস পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্ত ২৬ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা প্রদান ডিমলা খাদ্য গুদামে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ, দুই কর্মকর্তা স্ট্যান্ড রিলিজ বীরগঞ্জে সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলামকে ওলামা দলের পাল্টাপুর ইউনিয়ন কমিটির ফুলেল শুভেচ্ছা বীরগঞ্জে জমকালো আয়োজনে নাইট ক্রিকেট টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করলেন সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু নীলফামারীতে রেঞ্জ ডিআইজি: শৃঙ্খলা ও জনআস্থাই পুলিশের মূল শক্তি বীরগঞ্জে একুশ লাখ টাকার বেশি আত্মসাতের মামলায় ইটভাটা ম্যানেজার কারাগারে ডোমারে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী ও মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত ঢাক-ঢোল ও উল্লাসে রংপুরের বেতগাড়ীতে পালিত হলো শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী আনন্দ মিছিল ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত

করতোয়ার পাড়ে থেমে গেল একটি কণ্ঠ: ওপারে ভালো থাকুন জগেশ দা

আই জামান চমক, ঢাকা eye jaman chamok, Dhaka
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আই জামান চমক, icrbd24: করতোয়া তখন শান্ত। বিকেলের আলো নদীর জলে পড়ে একরকম সোনালি আভা তৈরি করেছিল। দেবীগঞ্জের সেই ডিসি পার্ক, পহেলা বৈশাখের মেলা বসেছে, মানুষের ভিড়, বাচ্চাদের হাসি, আর মঞ্চে গান। অথবা রামগঞ্জ বিলাসী উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠান, স্কুলের সেই পুরনো মাঠ, চেয়ার পাতা, শিক্ষক অভিভাবক ছাত্রছাত্রী সবাই একসাথে। জায়গা আলাদা হতে পারে, কিন্তু মুহূর্তটা একই থেকে যেত যখন মঞ্চে উঠতেন জগেশ দা।

গানটা ছিল তুমি এসেছিলে পরশু। খুব সাধারণ একটা লাইন। কিন্তু জগেশ দার কণ্ঠে এসে সেই লাইনটা যেন অন্যরকম হয়ে যেত। কাআআআআআল কেন আসোনি… এই টানটা তিনি এমনভাবে দিতেন যে গোটা মাঠ চুপ হয়ে যেত। মানুষ শুনত, শুধু কানে নয়, বুকের ভেতরেও। একটা গান কীভাবে এত মানুষকে একসাথে থামিয়ে দিতে পারে, এটা ভাবতে গেলে আজও অবাক লাগে।

জগেশ দা শারীরিকভাবে অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা ছিলেন। এই কথাটা লিখতে গিয়েও একটু থামলাম। কারণ এটা তার পরিচয়ের সবচেয়ে ছোট অংশ ছিল। তার হাসি, তার কণ্ঠ, এসব দিয়ে তিনি এই জনপদের মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন অনেক আগেই। কেউ তাকে দেখতে এসে ফিরে যায়নি খালি হাতে। একটা গান শুনিয়ে দিতেন, একটু হাসতেন, আর মানুষ ভুলে যেত বাকি সব।

একজন শিক্ষক হিসেবেও তার সুনাম কম ছিল না। ছাত্ররা তাকে সম্মান করত, ভালোবাসত। কিন্তু এসবের চেয়েও বড় কথা, তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। আজকাল এই কথাটা বলাই বোধহয় সবচেয়ে কঠিন প্রশংসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কত মানুষ আছে জ্ঞানে গুণে, কিন্তু ভালো মানুষ? সেই তালিকা ছোট হয়ে আসছে দিনে দিনে।

আমার সাথে জগেশ দার ম্যাসেঞ্জারে অনেকদিন কথা হচ্ছিল না। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো ব্যস্ত আছেন। তারপর মনে হলো, না, হয়তো আমার উপর রাগ করেছেন। কোনো কারণে অভিমান। মানুষ তো এমনই, একটু চুপ থাকলেই মনে হয় কিছু একটা হলো। কিন্তু ভুলটা ভাঙল যখন নদী সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্ণধার, আমার প্রিয় শিল্পী একে আজাদ ভাইয়ের কাছে জানলাম, জগেশ দা অসুস্থ। শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। রাগ অভিমান তো দূরের কথা, মানুষটা তো লড়ছিলেন নিজের শরীরের সাথে।

কবিতা পড়ি লাইভে জগেশ দাকে একদিন অতিথি করে নেওয়ার কথা ছিল। কথা তো অনেক কিছুরই থাকে। কিন্তু সময় সবসময় আমাদের হিসাব মতো চলে না। দুর্ভাগ্য বলি, নাকি নিয়তি, সেই সুযোগ আর হলো না। এখন মনে হয়, যদি আরেকটু আগে যোগাযোগ করতাম। যদি একটা ফোন করতাম। এই যদি শব্দটা বড় নিষ্ঠুর। জীবনের সবচেয়ে বেশি আফসোস বোধহয় এই ছোট ছোট যদিগুলো থেকেই জন্মায়।

অসুস্থতার খবর শুনে একটা লেখা লিখব ভেবেছিলাম তখনই। লিখিনি। কেন লিখিনি সেটা নিজেও ঠিক জানি না। হয়তো মনে হয়েছিল সময় আছে। কিন্তু এই উপমহাদেশের একটা পুরনো নিয়ম আছে, বেঁচে থাকতে গুণীর মূল্যায়ন হয় না। রবীন্দ্রনাথ একবার লিখেছিলেন, মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সমান। মৃত্যুকে তিনি প্রিয়জনের মতো দেখেছিলেন। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষরা মৃত্যুর পরেই কেন খুঁজে পাই মানুষটার আসল মূল্য? জগেশ দার ক্ষেত্রেও বোধহয় সেটাই হলো। তিনি বেঁচে থাকতে আমরা তার গান শুনেছি, হাততালি দিয়েছি, কিন্তু তার খোঁজ রাখিনি ঠিকমতো।

নজরুল লিখেছিলেন, বল বীর, বল উন্নত মম শির। এই কথাটা মনে পড়ে যখন ভাবি জগেশ দার কথা। শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়েও তিনি মাথা উঁচু করে বেঁচেছিলেন। কারো করুণা চাননি। নিজের গান দিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। এটাই তো আসল বীরত্ব। যুদ্ধের ময়দানে নয়, জীবনের ময়দানে।

আমরা কি পারি না, একটু আগেভাগে খোঁজ নিতে? আমাদের চারপাশে কত জগেশ দা আছেন, যারা নীরবে লড়ছেন, আর আমরা ব্যস্ত থাকছি নিজেদের জগতে। একটা ফোন কল কতটা সময় নেয়? পাঁচ মিনিট? দশ মিনিট? তবু সেটুকু সময় আমরা বের করতে পারি না।

জগেশ দা, আপনার কণ্ঠ থেমে গেছে ঠিকই, কিন্তু এই মাটির মানুষের স্মৃতি থেকে আপনি মুছে যাবেন না। করতোয়ার পাড়ে যতদিন গান বাজবে, ততদিন কোথাও না কোথাও আপনার সেই টানটা শোনা যাবে। কাআআআআআল কেন আসোনি।

ওপারে ভালো থাকুন জগেশ দা। এই অঞ্চলের মানুষ আপনাকে ভুলবে না।

লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839


এরকম আরও সংবাদ