• শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম
করতোয়ার পাড়ে থেমে গেল একটি কণ্ঠ: ওপারে ভালো থাকুন জগেশ দা গঙ্গাচড়ায় রি.কে.এস পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্ত ২৬ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা প্রদান ডিমলা খাদ্য গুদামে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ, দুই কর্মকর্তা স্ট্যান্ড রিলিজ বীরগঞ্জে সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলামকে ওলামা দলের পাল্টাপুর ইউনিয়ন কমিটির ফুলেল শুভেচ্ছা বীরগঞ্জে জমকালো আয়োজনে নাইট ক্রিকেট টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করলেন সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু নীলফামারীতে রেঞ্জ ডিআইজি: শৃঙ্খলা ও জনআস্থাই পুলিশের মূল শক্তি বীরগঞ্জে একুশ লাখ টাকার বেশি আত্মসাতের মামলায় ইটভাটা ম্যানেজার কারাগারে ডোমারে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী ও মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত ঢাক-ঢোল ও উল্লাসে রংপুরের বেতগাড়ীতে পালিত হলো শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী আনন্দ মিছিল ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত

ডিমলা খাদ্য গুদামে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ, দুই কর্মকর্তা স্ট্যান্ড রিলিজ

রাহেনা বারী আয়না, স্টাফ রিপোর্টার, নীলফামারী (ডিমলা)
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: নীলফামারীর ডিমলা সরকারি খাদ্য গুদামে একের পর এক অনিয়মের ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রশাসন অবশেষে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সর্বশেষ একটি বিশেষ আকস্মিক অডিটের পর গুদামের দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। তাৎক্ষণিক বদলি হওয়া এই দুই কর্মকর্তা হলেন ডিমলা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনার রশিদ এবং ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা বা ওসিএলএসডি নবাব আলী। গত ৩ সেপ্টেম্বর খাদ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (সংস্থাপন) অনির্বাণ চন্দ্র স্বাক্ষরিত এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনে তাঁদের এই বদলির নির্দেশ জারি করা হয়। সরকারি নির্দেশনায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনার রশিদকে চট্টগ্রামের দূরবর্তী সন্দ্বীপে এবং ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা নবাব আলীকে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার পাতাবুনিয়ায় জরুরিভিত্তিতে বদলি করা হয়েছে।
ঘটনাবলীর সূচনা ঘটেছিল গত আগস্ট মাসে, যখন ডিমলা সরকারি খাদ্য গুদামকে কেন্দ্র করে সরকারি নতুন বস্তা খোলা বাজারে বিক্রি, সাধারণ মানুষের জন্য রাখা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল সরবরাহে ব্যাপক অনিয়ম এবং বিভিন্ন অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সামনে আসে। এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে পুরো অঞ্চল জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সংবাদ প্রকাশের পরপরই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে নীলফামারী জেলা খাদ্য বিভাগ এবং ঢাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় খাদ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পৃথক তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জেলা খাদ্য বিভাগ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি এবং খাদ্য অধিদপ্তর এক সদস্যের আরেকটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে স্থানীয়দের দাবি, ডিমলা খাদ্য গুদামের এই অস্বচ্ছ কার্যক্রম ও অনিয়ম নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ অনেক আগে থেকেই দানা বাঁধছিল।
এর আগে গত ১৯ মে দুই কর্মকর্তার বিপুল পরিমাণ ঘুষ বাণিজ্যে ক্ষতির পরিমাণ দেড় কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া সংক্রান্ত এবং পরবর্তীতে ২২ মে টিসিবির ডিলারদের মাধ্যমে পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত চাল বিক্রির অভিযোগ তুলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তৎকালীন সময়েও জেলা খাদ্য বিভাগ থেকে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে সেই সময়কার তদন্তের গতিপ্রকৃতি ও মূল প্রতিবেদন নিয়ে শুরু থেকেই জনমনে নানা প্রশ্ন থেকে যায়। অভিযোগ ওঠে, জেলা খাদ্য বিভাগের গঠিত সেই কমিটি সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানী গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করে কেবল খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সুবিধাভোগী ডিলারদের কাছ থেকে লেনদেন হয়নি মর্মে একটি লিখিত কাগজ নিয়েই তাদের কাজ শেষ করে। এর ফলে সেই তদন্তের নিরপেক্ষতা, পরিধি ও প্রকৃত কার্যকারিতা ব্যাপকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।
তবে পুরো ঘটনার মোড় ঘুরে যায় যখন কেন্দ্রীয় খাদ্য অধিদপ্তর নিজস্ব উদ্যোগে আলাদাভাবে তদন্ত কাজ শুরু করে। গত ২৭ আগস্ট খাদ্য অধিদপ্তরের গঠিত এক সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান এবং রংপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সালেহ আজিজ নিজে সরাসরি ডিমলা সরকারি খাদ্য গুদামে সরেজমিনে তদন্তে আসেন। তদন্ত পরিচালনাকালে তিনি শুধু দাপ্তরিক কাগজপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার এবং সরেজমিনে কাজ করা গণমাধ্যমকর্মীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। সেই সময় ডিমলা খাদ্য গুদামের অনিয়মের নানা সুনির্দিষ্ট তথ্য, নথিপত্র এবং বাস্তব প্রমাণাদিসহ বিভিন্ন অভিযোগ তদন্ত কমিটির কাছে তুলে ধরা হয়। ফলে আগের দুর্বল তদন্তের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে অভিযোগগুলোর গভীরতা ও সত্যতা যাচাইয়ের একটি প্রকৃত সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তদন্তের এই ধারাবাহিকতায় গত ২ সেপ্টেম্বর খাদ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মনিরুজ্জামান হুট করেই ডিমলা সরকারি খাদ্য গুদামে একটি আকস্মিক অডিটে উপস্থিত হন। দিনব্যাপী পরিচালিত সেই থমথমে অডিটে গুদামে সংরক্ষিত সরকারি বস্তা, রক্ষিত চাল ও ধানের সুনির্দিষ্ট হিসাবের সাথে মাঠপর্যায়ের খতিয়ান মেলানো হয়। বিস্তারিত তথ্য যাচাইয়ের পর সরকারি খাতা-কলমের হিসাবের সঙ্গে গুদামের বাস্তব মজুদের এক বড় ধরনের গরমিল এবং মারাত্মক প্রশাসনিক অনিয়মের প্রমাণ পান কর্মকর্তারা। উপস্থিত কর্মকর্তাদের মতে, রেজিস্টারের কাগজের সাথে গুদামের বাস্তব মালের এই অমিলের ব্যাপ্তি কতখানি এবং এর পেছনে নির্দিষ্ট কার কী পরিমাণ দায় রয়েছে, তা অভ্যন্তরীণ দাপ্তরিক তদন্ত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গভাবে উঠে আসবে।
অডিট শেষ হওয়ার পরপরই একই দিন গভীর রাতে পরিস্থিতি তদারক করতে খাদ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের উপ-পরিচালক (মামলা ও তদন্ত শাখা) ফজলে রাব্বি হায়দারের নেতৃত্বে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি শক্তিশালী দল ডিমলা সরকারি খাদ্য গুদামে এসে পৌঁছান। রাতে উপস্থিত হয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা পুরো গুদামের হিসাবের খাতা ও বর্তমান কার্যক্রম পুনরায় খুঁটিয়ে দেখেন এবং বেশ কিছু স্পষ্ট অসংগতি প্রত্যক্ষ করেন। অনিয়মের পরিধি দেখে তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ডিলারদের চাল সরবরাহ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ঠিক পরদিনই অর্থাৎ ৩ সেপ্টেম্বর তড়িঘড়ি করে অনিয়মে অভিযুক্ত সেই দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজের লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন, স্ট্যান্ড রিলিজ করা নিজেই কোনো চূড়ান্ত শাস্তি বা অপরাধ প্রমাণের আইনি সনদ নয়। তবে গণমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের পর একের পর এক উচ্চপর্যায়ের অডিট এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আকস্মিক পরিদর্শনের পরই এই দ্রুত বদলির আদেশ প্রমাণের ইঙ্গিত দেয় যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। ডিমলা সরকারি খাদ্য গুদামের পুরো কার্যক্রমে প্রকৃতপক্ষে কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি হয়েছে কি না, কত টাকার আর্থিক তছরুপ ঘটেছে এবং এর পেছনে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা কতটুকু ছিল, তা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আলোর মুখ দেখা উচিত। বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জন্য পরিচালিত খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল নিয়ে যেকোনো ছিনিমিনি খেলার কঠোর বিচার হওয়া দরকার।
পাশাপাশি যদি তদন্তের পর অভিযোগগুলোর সত্যি কোনো ভিত্তি না পাওয়া যায়, তবে তা স্পষ্ট করে ওই কর্মকর্তাদের সম্মানজনক অবস্থান ফিরিয়ে দেওয়াও প্রশাসনের দায়িত্ব। স্থানীয় জনসাধারণের মতে, কেবল দূরবর্তী কোনো অঞ্চলে বদলি করে দিলেই এত বড় একটি সরকারি গুদামের অনিয়মের অধ্যায় শেষ হয়ে যেতে পারে না। তদন্ত কমিটির আসল রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা, সরকারি খাদ্যের কোনো অপচয় বা ক্ষতি হয়ে থাকলে তা উদ্ধার করা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সময়ের দাবি। এই বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য ডিমলা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনার রশিদ এবং ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা নবাব আলীর সাথে বিভিন্ন মাধ্যমে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839


এরকম আরও সংবাদ