আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণকে কেন্দ্র করে সুবিধাভোগী প্রান্তিক মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কার্ডধারীদের জন্য নির্ধারিত ৩০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২৮ থেকে ২৯ কেজি। ফলে প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে অসহায় মানুষগুলোকে ১ থেকে ২ কেজি চাল কম দেওয়া হচ্ছে বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে। শুধু ওজনেই নয়, বিতরণের জন্য ডিলারের গুদামে রাখা চালের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
চালগুলোতে পোকা ধরা, পচা, ভাঙা, ধুলা-বালি ও ময়লার উপস্থিতি দেখা গেছে। এমনকি কোনো কোনো বস্তায় সাদা, হলুদ, বিবর্ণ ও কালচে রঙের ভিন্ন ধরনের চালের মিশ্রণ রয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের বিভিন্ন ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্রে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। নিম্নমানের এই চাল পাওয়ার কারণে অনেক সুবিধাভোগী চাল নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অথচ ডিলার পয়েন্টে চাল বিতরণের সময় সরকারি কোনো কর্মকর্তার তদারকি বা উপস্থিতি ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ডিমলার ১০টি ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মোট ২১ হাজার ৩৩৫ জন কার্ডধারী সুবিধাভোগী রয়েছেন। চলতি পর্যায়ে তাঁদের মাঝে বিতরণের জন্য মোট ৬৪০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নিয়মানুযায়ী, এই কার্ডধারীরা প্রতি কেজি ১৫ টাকা মূল্যে মাসে ৩০ কেজি চাল কেনার সুযোগ পান। যার মোট মূল্য দাঁড়ায় ৪৫০ টাকা। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহীত এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন উপজেলার ৪১ জন ডিলার। ভূমিহীন, প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত নারী এবং প্রতিবন্ধী মানুষ এই কর্মসূচির মূল সুবিধাভোগী।
গত ১৬ আগস্ট থেকে উপজেলার ১০ ইউনিয়নের ডিলাররা উপজেলা সদরের খাদ্যগুদাম থেকে চাল উত্তোলন শুরু করেন। পরবর্তীতে সেই চাল নিজ নিজ বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু ওজনে কম দেওয়া এবং নিম্নমানের চালের কারণে বিপাকে পড়েছেন হতদরিদ্র মানুষগুলো। তাঁরা ৪৫০ টাকা পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করেও নির্ধারিত পরিমাণ চাল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে নিম্নআয়ের এই মানুষগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের সুবিধাভোগী আয়েশা আক্তার, মোজাম্মেল হক, ইমান আলী, নূর হোসেন ও দেলোয়ার হোসেন জানান, এর আগে কখনো এমন নিম্নমানের চাল দেওয়া হয়নি। এবারের চালে প্রচুর পোকা, ধুলা-ময়লা ও বিভিন্ন রঙের চাল মিশ্রিত রয়েছে। চালগুলো খাওয়ার সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে পড়েছে বলে অনেকে তা নিতে চাচ্ছেন না। তাঁরা আরও জানান, ডিলারের লোকজন তাঁদের ২৮ বা অথচ ২৯ কেজির বেশি চাল দিচ্ছে না। অথচ তাঁদের কাছ থেকে পুরো ৪৫০ টাকাই আদায় করা হচ্ছে।
এদিকে সুবিধাভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ডিলার ছকিউদ্দিন মানিক, কনেশ্বর চন্দ্র রায় ও মনিরুজ্জামান মানিক দাবি করেছেন, তাঁরা উপজেলা খাদ্যগুদাম থেকে যেভাবে চাল পেয়েছেন, ঠিক সেভাবেই বিতরণ করছেন। চালের মান নির্ধারণ বা গুদামের সরবরাহ তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে তাঁরা জানান।
অভিযোগ পাওয়ার পর ডিমলা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মামুনার রশীদকে বিষয়টি জানানো হলেও তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেননি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মামুনার রশীদ জানিয়েছেন, গুদাম থেকে কম চাল দেওয়া এবং নিম্নমানের চাল সরবরাহের বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে এবং এটি খতিয়ে দেখা হবে। অন্যদিকে ডিমলা খাদ্যগুদামের খাদ্য পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নবাব চাল পচা বা খাবার অনুপযোগী হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, গুদাম থেকে ভালো চালই সরবরাহ করা হয়েছে এবং দীর্ঘদিন গুদামে থাকলে রঙের কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।
ঘটনাটি নিয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান জানিয়েছেন, বিষয়টি জানার পর তিনি উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) সৈয়দ আতিকুল হকও বলেছেন, এ ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো দেশের স্বল্প আয়ের ও প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করা এবং তাঁদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেখানে ওজনে কম দেওয়া কিংবা অস্বাস্থ্যকর ও নিম্নমানের চাল সরবরাহ করা হলে সরকারের মহৎ উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। স্থানীয় সুবিধাভোগীরা এই অনিয়মের সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। সেইসঙ্গে চালের সঠিক ওজন ও মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মানুষগুলো।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ:
01718456839