আই জামান চমক, icrbd24: আজ ২৮ এপ্রিল।
পাবনার শাহজাদপুরের জৈন্তিহার গ্রামে সেদিন কোনো ঢাকঢোল বাজেনি। কোনো আলোকসজ্জা ছিল না। কিন্তু যে শিশুটি সেদিন জন্ম নিয়েছিল, সে একদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালাবে — এটা কি কেউ জানত? আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল। নামের মধ্যেই যেন ভবিষ্যতের ঘোষণা লুকিয়ে ছিল। আজ তাঁর আটত্তরতম জন্মদিন। না, ঠিক করে বলি — আজ তিনি পা দিলেন পূর্ণ আশিতে।
আশি বছর। একটা মানুষের জীবনে এই সংখ্যাটা কেবল বয়সের হিসাব নয়, এটা একটা যুগের সাক্ষ্য।
আমি যখন ভাবি এই মানুষটির কথা, তখন শুধু রুপালি পর্দার নায়ক চোখে ভাসে না। ভাসে একটি অবিচল মানুষের ছবি — যিনি ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে অভিনয় করেছেন, যিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কে মাস্টার্স করেছেন, যিনি কবরীর সঙ্গে ‘বিনিময়’ ছবিতে নায়ক হিসেবে প্রথম পা ফেলেছেন — আর তারপর থেকে আজ পর্যন্ত থামেননি। থামার কথা ভাবেননিও।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘মেগাস্টার’ শব্দটি কজনের নামের পাশে বসেছে? একজনের। শুধু একজনের। উজ্জ্বল।
তবু এই মানুষটিকে নিয়ে লিখতে বসে আমার মনে হচ্ছে, পর্দার কথা বললেই তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় দেওয়া হয় না। কারণ উজ্জ্বল শুধু অভিনেতা নন। তিনি একটি বিশ্বাসের নাম। একটি আদর্শের ধারক।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এ দেশে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার চালু করেছিলেন, অনুদান প্রথা এনেছিলেন, শিল্পীদের জন্য কল্যাণ তহবিল গড়েছিলেন। উজ্জ্বল সেই স্বপ্নের সাক্ষী ছিলেন, সঙ্গীও ছিলেন। জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দল বিএনপির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আজকের নয় — শৈশব থেকে, বিশ্বাস থেকে, রক্তের ভেতর থেকে আসা। সেই বিশ্বাসে আজও তিনি অটল। বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন — পদের জন্য নয়, মনে হয় দায়িত্ববোধ থেকে।
এটাই আমাকে ভাবায়।
যখন অনেকে সুবিধার বাতাস বুঝে পাল পাল্টায়, যখন চলচ্চিত্রের অনেক পরিচিত মুখ বিগত দিনে ক্ষমতার আঁচলে আশ্রয় নিয়েছিলেন — উজ্জ্বল তখন নীরব ছিলেন, কিন্তু সরে যাননি। আপোস করেননি। বরং বলেছিলেন — রাজনীতি রাজনীতির মাঠে হবে, এফডিসি রাজনীতির জায়গা নয়। কথাটা সহজ শোনায়, কিন্তু পরিবেশ বুঝলে বোঝা যায় এটি বলতে কতটা সাহস লাগে।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।” উজ্জ্বল একলা চলেননি, কিন্তু ভিড় দেখে চলেননি। নিজের পথ নিজে বেছেছেন।
আজ, এই মুহূর্তে, যখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার ঊষালগ্ন, যখন মাননীয় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এ দেশের মানুষ একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে — তখন উজ্জ্বলের মতো মানুষেরাই সাংস্কৃতিক শক্তির মেরুদণ্ড। তাঁরা শুধু পর্দায় নায়ক ছিলেন না। তাঁরা জীবনেও নায়ক।
একটি কথা আমার মাঝে মাঝে মনে হয় — একটি জাতির আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখে তার সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতিকে যিনি বুকে ধরে রাখেন, রাজনৈতিক ঝড়ে হেলেন না, আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন না — তিনিই প্রকৃত নায়ক। উজ্জ্বল সেই নায়ক।
দেড়শোরও বেশি ছবি, একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, দশকের পর দশকের সংগ্রাম — এসব সংখ্যা দিয়ে উজ্জ্বলকে বোঝানো যাবে না। তাঁকে বুঝতে হলে দেখতে হবে, এতকিছুর পরেও কীভাবে একজন মানুষ তাঁর বিশ্বাসকে অটুট রাখেন। কীভাবে আশি বছর বয়সেও বলতে পারেন — আমি ছিলাম, আছি, থাকব।
আজ তাঁর জন্মদিনে একটাই কথা বলতে চাই।
স্যালুট, নায়ক।
শুধু পর্দার নয় — বাস্তবের।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839