আই জামান চমক, icrbd24: গাজীপুরের কাশিমপুরে ডালাস সিটি নামে একটি জায়গা আছে। নামটা শুনলে মনে হয় সুদূর টেক্সাসের কোনো ছবি। কিন্তু সেখানকার বাস্তবতা ভিন্ন। সেই বাস্তবতায় একজন মানুষ আছেন, তিনটি মসজিদের সভাপতি। বায়তুন নূর জামে মসজিদ, মুক্তিযোদ্ধার টেক জামে মসজিদ, বায়তুল মামুর জামে মসজিদ। নাম তাঁর আব্দুস সালাম দেওয়ান। বছরের পর বছর মানুষের পাশে থেকেছেন। বিবাদ মিটিয়েছেন। মানুষ কাঁদলে পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই মানুষটির বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ ছিল না কখনো। একটিও না।
এপ্রিলের উনিশ তারিখ থেকে একটা ঘটনার শুরু। প্রতিবেশীর বিবাদ। আলিয়া আক্তার নামের এক নারী মারধরের শিকার হয়েছেন, তার বোনের গলার সোনার চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, রাতের পর রাত চলেছে অত্যাচার। তিনি থানায় গেছেন। কিন্তু থানা মামলা নেয়নি। এই কাণ্ড দেখে সালাম দেওয়ান এগিয়ে এসেছিলেন মীমাংসার উদ্দেশ্যে। এটুকুই তাঁর অপরাধ।
এর আগে কথিত সাংবাদিক সীমান্ত এবং গাজীপুর মহানগরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুন ও সহ-সভাপতি হাফিজ তাঁর কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা চেয়েছিলেন। সালাম দেওয়ান সাফ বলে দিয়েছিলেন, চাঁদা দেবেন না। এটুকুও কি অপরাধ? না, এটা সাহস। কিন্তু এই সাহসটুকুই তাঁকে ডুবিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
সীমান্ত সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তাঁর সামাজিক মর্যাদা শেষ করে দেবেন। জেল খাটাবেন। হুমকিটা হাওয়ায় উড়িয়ে দেননি তারা। পঁচিশে এপ্রিল কাশিমপুর থানায় মামলা দায়ের হলো। নম্বর এনআর-৩৩/১২০। এক নম্বর আসামি আব্দুস সালাম দেওয়ান। অথচ আলিয়া আক্তারের মূল লিখিত অভিযোগে এই নামটি ছিলই না। ছিল না। তারপরও তিনি এক নম্বর আসামি।
এই হলো সেই যাদু, যা টাকার গন্ধে কাজ করে।
আমি একটি কথা বুঝি না। বুঝতে চাইও না আসলে। যে মানুষ জীবনের প্রতিটি ভোরে মসজিদের দিকে হাঁটেন, যিনি এলাকার মানুষের বিবাদে মধ্যস্থতা করেন বিনা স্বার্থে, তাঁকে ফাঁসাতে হলে কতটা নামতে হয়? কতটা নীচে গেলে একজন মানুষ এই কাজ করতে পারে? দেওয়ান সাহেবের চাকর-বাকর হওয়ার যোগ্যতা যাদের নেই, তারা তাঁকে খেলা দেখাতে বসেছেন। এই দৃশ্যে করুণা হয়, রাগ হয় না।
কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর কথাটা বললেন কাশিমপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোল্লা মোহাম্মদ খালিদ হোসেন। জানতে চাওয়া হয়েছিল বিষয়টি সম্পর্কে। তিনি জানালেন, ছুটিতে আছেন। তারপর বললেন, “সাংবাদিক সীমান্ত সাহেবের সাথে কথা বললেই হবে।” একজন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তদন্তের প্রশ্নে একজন নাগরিককে একজন কথিত সাংবাদিকের কাছে পাঠাচ্ছেন। এই একটি বাক্যে পুরো ত্রিভুজটা স্পষ্ট হয়ে যায়। সাংবাদিক, বিএনপির ওয়ার্ড নেতা আর ওসি। তিনটি শক্তি মিলে একজন নিরীহ মানুষের চারপাশে একটা দেয়াল তুলেছে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ-ধূলার তলে।” কিন্তু এই মাথানতি তাঁর কাছে, যিনি সত্য। যারা মিথ্যার কারখানা চালায়, তাদের সামনে মাথা নোয়ানোর ধর্ম আমার নেই।
স্থানীয় সূত্র বলছে, সীমান্ত সাংবাদিকতার আড়ালে যা করেন, তার ফলভোগ হয় নানা স্তরে। থানা পর্যন্ত সেই ভাগাভাগি পৌঁছায়। এটা যদি সত্য হয়, তাহলে কাশিমপুরের সাধারণ মানুষ কোথায় যাবেন? বিপদে পড়লে থানায় যাবেন, থানা বলবে সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করুন। এই দেশে বিচার পাওয়ার এটাই কি রাস্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে?
আলিয়া আক্তার মার খেয়েছেন, চিকিৎসা নিয়েছেন শহীদ তাজউদ্দিন হাসপাতালে। তাঁর বোনের গলার চেইন গেছে। মামলা দিয়েছেন। তারপরও মামলা নেয়নি থানা। উল্টো যিনি পাশে দাঁড়াতে এসেছিলেন তিনি হলেন আসামি। এই ছবিটা দেখে চোখ বন্ধ করা যায়। কিন্তু বন্ধ চোখে সত্য থাকে না।
এবার একটু ব্যক্তিগত কথা বলি।
সালাম দেওয়ানের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। কখনো দেখা হয়নি। একই মঞ্চে বসিনি, একসাথে চা খাইনি। কিন্তু তিনি আমার স্বজন। এই কথাটা বলতে আমার এক মুহূর্তও দ্বিধা হয় না। কারণ তিনি ইসলামের পক্ষের মানুষ। ন্যায়ের পথে হাঁটা মানুষ। সত্যের সঙ্গে থাকা মানুষ। এই পরিচয়ের চেয়ে বড় আত্মীয়তা আমি চিনি না।
আমার জীবনে বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটা একটু আলাদা। যে মানুষ সত্যের পক্ষে সাহস নিয়ে দাঁড়ায়, সে আমার পরম বন্ধু। যে মানুষ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নুয়ে পড়েননি, সে আমার পরম আত্মীয়। রক্তের সম্পর্ক লাগে না। এলাকা লাগে না। দলের পরিচয় লাগে না। সালাম দেওয়ান শুধু একজন নিরীহ, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে ষড়যন্ত্রের মুখে পড়েছেন। এটুকুই যথেষ্ট। এটুকুই আমার কাছে সব পরিচয়ের চেয়ে বড়।
যদি আমি এই মানুষটির পক্ষে কথা না বলি, তাহলে আমি আমার নিজের সত্তার কাছে দায়বদ্ধ হয়ে থাকব। সেই ঋণ শোধ হওয়ার নয় । কাজেই কলম তুলেছি।
আমি চাই, সালাম দেওয়ানের মতো মানুষেরা যেখানেই থাকুন, পৃথিবীর যে কোণেই থাকুন, জানুন যে একা নন। চমক আছে। চমক থাকবে। এই কথাটা আমি শুধু সালাম দেওয়ানকে বলছি না, বলছি প্রতিটি মজলুম মানুষকে, যিনি ন্যায়ের পথে হেঁটে বিপদে পড়েছেন, যাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরা হয়েছে, যিনি ভাবছেন কেউ নেই। আছে। চমক আছে।
সালাম দেওয়ানের মতো মানুষেরা হারে না। ইতিহাস সাক্ষী, মিথ্যার দেয়াল একদিন ভাঙে। সত্য হয়তো ধীরে হাঁটে, কিন্তু থামে না। যে মানুষ তিনটি মসজিদের আমানত বুকে বহন করেন, তাঁকে মিথ্যা মামলায় দমিয়ে রাখা যায় না। চাঁদার টাকায় কেনা মামলা সত্য হয় না, যত কাগজেই সই থাকুক।
আমি বিষয়টি দেখছি। প্রমাণ সংগ্রহ হচ্ছে। ত্রিশক্তির এই মিথ্যা বলয় আলোয় আসবে। গাজীপুর মহানগর পুলিশের উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে জিজ্ঞেস করা দরকার, একজন ওসি কি তাঁর দায়িত্ব সাংবাদিকের কাঁধে তুলে দিতে পারেন? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন অন্যায়কারীকে ছাড় দেওয়া হবে না। কথাটা কি শুধু জাতীয় মঞ্চের জন্য, নাকি কাশিমপুরের ডালাস সিটির জন্যও?
সালাম দেওয়ানের মতো মানুষেরা যদি মীমাংসা করতে গিয়ে আসামি হন, তাহলে একটা সমাজ আর কতদিন সুস্থ থাকে? চাঁদা না দেওয়ার সাহস যদি জেলের পথ খুলে দেয়, তাহলে সাহসী মানুষেরা কোথায় যাবেন?
আমার কাছে আসবেন। সেটুকুই আমার কাজ। সেটুকুই আমার পরিচয়।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839।