আই জামান চমক, icrbd24: করতোয়ার চরে যখন কাশফুল ফোটে, তখন দূর থেকে দেখে মনে হয় সব সাদা, সব নিষ্পাপ। কাছে গেলে বোঝা যায়, কোনটা ফুল আর কোনটা শুধু আগাছা। সাংবাদিকতার মাঠেও এখন অনেক কাশফুল ফুটেছে। দূর থেকে বোঝার উপায় নেই কোনটা আসল।
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসককে নিয়ে সম্প্রতি একটি টেলিভিশনে যা দেখানো হলো, তা দেখে বুকের ভেতরে একটা চাপা কষ্ট জমলো। অনুভব করলাম, এই দেশে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া কতটা সহজ হয়ে গেছে। প্রশ্নটা আমার মনে বারবার ঘুরছে, এই সহজ হওয়াটা কি সাংবাদিকতার জন্য গর্বের, নাকি লজ্জার?
জেলা প্রশাসক সরকারি গাড়িতে ব্যক্তিগত কাজে বেরিয়েছেন। ব্যস, এটুকুই সংবাদ। ক্যামেরা ঘুরলো, মাইক্রোফোন এগিয়ে দেওয়া হলো, প্রশ্ন করা হলো যেন মহাপাপ ধরা পড়েছে। অথচ যে আইনের আলোয় এই প্রশ্ন করা হলো, সেই আইনটি কি একবারও পড়া হয়েছিল?
বাংলাদেশের সরকারি যানবাহন নীতিমালা স্পষ্ট। জেলা প্রশাসক চব্বিশ ঘণ্টা সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অধিকার রাখেন (প্রাধিকার শব্দটা অনেকেই জানেন না বিধায়, এড়িয়ে গেলাম)। সরকারি কাজে, ব্যক্তিগত কাজে, শুক্রবারে, শনিবারে, যেকোনো দিনে। তাঁর পরিবার, স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান, তারাও সেই গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন। একমাত্র শর্ত হলো জ্বালানি। মাসে ২১০ লিটার তেল বরাদ্দ। এর বেশি খরচ হলে নিজের পকেট থেকে দিতে হবে। এটুকুই নিয়ম। এর মধ্যে অপরাধ কোথায়?
তাহলে প্রশ্নটা উঠছে কোথা থেকে?
একাত্তর টিভির সংবাদকর্মী হয়তো এই আইন জানতেন না। গরম সাংবাদিক, উৎসাহ বেশি, অভিজ্ঞতা কম। এটা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু যিনি সংবাদটি সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন, সিনিয়র সম্পাদক, প্রবীণ সহকর্মী, তিনিও কি জানতেন না? তিনিও কি একবার ভাবলেন না যে প্রচার করার আগে বিষয়টি যাচাই করে নেওয়া উচিত?
সম্ভবত ভাবেননি। কারণ হুজুগের বাজারে যাচাই করার সময় কই?
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সত্যকে বড় করে দেখতে হলে মিথ্যাকে ছোট করতে হয়। আমাদের এখন সত্যকে ছোট করে মিথ্যাকে বড় করার একটা বিপজ্জনক অভ্যাস তৈরি হয়েছে। না জেনে, না বুঝে, শুধু একটা ভাইরাল হওয়ার লোভে, একজন প্রশাসকের মান মর্যাদা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হলো। এটা কি সাংবাদিকতা? নাকি এটা সেই কাজ, যার জন্য আইনে প্রতিকারের ব্যবস্থা আছে?
বিভ্রান্তি ছড়ানো, মিথ্যা তথ্য প্রচার করে কারো সম্মানহানি করা, এগুলো শুধু নৈতিক অপরাধ নয়, এগুলো আইনি অপরাধও। যারা এই সংবাদ তৈরি করেছেন, প্রচার করেছেন, তারা আইনের লঙ্ঘন করেছেন। জেলা প্রশাসক নন।
আজকাল সাংবাদিক হওয়াটা সহজ হয়ে গেছে। হাতে একটা স্মার্টফোন আর একটা মাইক্রোফোন থাকলেই হলো। তার ওপর যদি কোনো বড় পত্রিকা বা টেলিভিশনের লোগো ঝোলানো থাকে, তাহলে তো আর কথাই নেই। দুনিয়া জয় করা যায়। কিন্তু সাংবাদিকতার দায়িত্বটা সহজ হয়নি। সেটা আগেও কঠিন ছিল, এখনো কঠিন। তথ্য যাচাই করা, আইন বোঝা, মানুষের সম্মানের কথা ভাবা। এই কঠিন কাজটুকু না পারলে ক্যামেরা হাতে দাঁড়ানোর অধিকার কতটুকু থাকে, সেটা একটু ভাবা দরকার।
মন্দার বাজারে দোকান জমজমাট থাকে। সাংবাদিকতার দোকানও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু যে দোকানে ভেজাল মাল বিক্রি হয়, সেই দোকানের বিশ্বাসযোগ্যতা একদিন ফুরিয়ে যায়। ক্রেতা সরে যায়। পাঠক সরে যায়। দর্শক সরে যায়।
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসকের কাছে বিনম্র ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। প্রকাশ্যে। সেই একই ক্যামেরায়, যেই ক্যামেরায় তাঁকে অপদস্থ করা হয়েছিল।
আমরা যে দেশে বাস করি, সেখানে দোষ না করেও অপরাধীর মুকুট পরতে হয়। আর যারা দোষ করে, তারা মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায়। এই উল্টো স্রোতে দাঁড়িয়ে কলম ধরা কঠিন। তবু ধরতে হবে। কারণ কলম যদি সত্যের পক্ষে না দাঁড়ায়, তাহলে তাকে কলম বলা যায় না। তাকে বলতে হবে শুধু একটা অস্ত্র, যা ভুল হাতে পড়েছে।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839