আই জামান চমক: দিনাজপুরের মাটি বরাবরই কঠিন মানুষ তৈরি করে। এই মাটিতে ধান হয়, কুয়াশা নামে, আর মাঝে মাঝে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেয় যারা নিজেদের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে — স্বপ্ন দেখা অপরাধ নয়, তা পূরণ করার সাধ্যও মানুষের থাকে।
মোঃ মুকুল হোসেনের গল্পটা শুনলে প্রথমে বিশ্বাস হতে চায় না। একজন পুলিশ কনস্টেবল — ১৭তম গ্রেড, সরকারি মইয়ের একদম নিচের ধাপ — সে কিনা একদিন উঠে আসবে সহকারী পুলিশ সুপারের চেয়ারে? ৮ম গ্রেড? বিসিএস সমমানের পদমর্যাদা?
কিন্তু হয়েছে। সত্যিই হয়েছে।
আমি ভাবি, ওই মানুষটার রাতগুলো কেমন ছিল। ডিউটি শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন বইয়ের পাতা খুলতে বসেছেন, তখন কি মনে হয়নি — এত কষ্ট কীসের? এমনি তো চলছে, এমনি চললেও কী এমন ক্ষতি? অনেকেই তো এই প্রশ্নের সামনে থেমে যায়। মুকুল হোসেন থামেননি।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।” এই একা চলার সাধনা খুব কম মানুষের পক্ষে সম্ভব। বিশেষত যখন আশেপাশের সবাই বলছে — তোমার দিয়ে হবে না, তুমি কে, তুমি তো কনস্টেবল। সমাজ বড় নিষ্ঠুর এই জায়গায়। মানুষকে তার পদ দিয়ে মাপে, সম্ভাবনা দিয়ে নয়।
কিন্তু পরিশ্রম কাউকে চেনে না। সে শুধু ফল দেয়।
দিনাজপুরের এই মানুষটির পদোন্নতির খবর যখন ছড়িয়ে পড়ল, অনেকেই বলল — ভাগ্য ভালো ছিল। আমি এই কথাটা মানি না। ভাগ্য হয়তো একটু সহায় থাকে, কিন্তু শূন্য থেকে এএসপি — এটা কেবল ভাগ্যের খেলা নয়। এটা বছরের পর বছরের নিঃশব্দ যুদ্ধ। নিজের সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে, ক্লান্তির সঙ্গে।
আমাদের এই দেশে কাঠামো অনেক জায়গায় মানুষকে আটকে রাখে। যে যেখানে জন্মেছে, যে যে শ্রেণিতে ঢুকেছে — সেখান থেকে বের হওয়া কঠিন। তবু মুকুল হোসেনরা বের হন। এবং বের হয়ে পেছনে তাকিয়ে বলেন — পথ ছিল, শুধু হাঁটার সাহস দরকার ছিল।
এই গল্পটা শুধু একজন মানুষের পদোন্নতির গল্প নয়। এটা হাজার তরুণের জন্য একটি দরজা খুলে দেওয়ার গল্প। যে তরুণ ভাবছে — আমার কোনো তদবির নেই, বড় পরিবার নেই, পরিচয় নেই — সে যেন এই মানুষটার জীবন দেখে বুঝতে পারে, পরিচয়ের চেয়ে পরিশ্রম বড়।
আপনি কি ভাবছেন আপনার স্বপ্নটা বেশি বড়? তাহলে একবার ভাবুন — কনস্টেবলের পোশাকে যে মানুষটা পথ হেঁটেছেন, তিনিও একদিন ঠিক এমনই ভেবেছিলেন হয়তো। তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন — ভাবতে থাকব না, করতে থাকব।
শূন্য থেকে শুরু হয় সবচেয়ে সত্যিকারের যাত্রা।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839