পঞ্চগড়ের সীমান্তঘেঁষা জনপদে কনকনে শীতের মাঝেও নির্বাচনী উত্তাপের কমতি ছিল না। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হিমালয় কন্যাখ্যাত এই জেলার দুটি আসনেই ভোটাররা তাদের রায় জানিয়েছেন অনেকটা একতরফাভাবেই। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ শেষ হলেও ফলাফলের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে এক অভাবনীয় চিত্র। নির্বাচনী লড়াইয়ে টিকে থাকতে না পেরে দুই আসনের মোট ১১ জন প্রার্থী তাদের জামানত হারিয়েছেন।
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী মো. সায়েমুজ্জামান স্বাক্ষরিত প্রাথমিক বেসরকারি ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পঞ্চগড়-১ ও ২ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ ছিল বিএনপি এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের মধ্যে। বিধি অনুযায়ী, প্রদত্ত মোট বৈধ ভোটের আট ভাগের এক ভাগ ভোট পেতে ব্যর্থ হওয়ায় বাকি প্রার্থীরা তাদের জামানত রক্ষা করতে পারেননি।
পঞ্চগড়-১ আসনে মোট ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৭০০ ভোটারের মধ্যে বৈধ ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার ২৫টি। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী এই আসনে জামানত রক্ষার ন্যূনতম সীমা ছিল ৪৩ হাজার ৭৫৪ ভোট। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৭৬ হাজার ১৬৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির মো. সারজিস আলম শাপলা কলি প্রতীকে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ ভোট পেয়ে নিজের জামানত রক্ষা করতে সক্ষম হলেও বাকি পাঁচ প্রার্থীর কপালে জুটেছে ভরাডুবি। জামানত হারানোদের মধ্যে রয়েছেন জাসদের নাজমুল হক প্রধান, সুপ্রীম পার্টির আব্দুল ওয়াদুদ, লেবার পার্টির ফেরদাউস আলম, গণঅধিকার পরিষদের মাহাফুজার রহমান এবং বিএনএফ-এর সিরাজুল ইসলাম। তাদের প্রাপ্ত ভোট ন্যূনতম সীমার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি।
অন্যদিকে, পঞ্চগড়-২ আসনেও চিত্রটি ছিল প্রায় একই রকম। ৪ লাখ ১৭ হাজার ৫২৯ জন ভোটারের এই আসনে বৈধ ভোট পড়েছে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৪৯টি। এখানে জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৯ bin ৩৯৪ ভোট। বিএনপির ফরহাদ হোসেন আজাদ ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৫০ ভোট পেয়ে বড় জয় তুলে নিয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. সফিউল আলম সুফি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৬২ ভোট পেয়ে লড়াইয়ে টিকে ছিলেন। তবে এই দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর বাইরে থাকা বাকি ছয়জন প্রার্থীই ভোটারদের মন জয়ে ব্যর্থ হয়ে জামানত হারিয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদ হোসেন সুমন থেকে শুরু করে জাতীয় পার্টির লুৎফর রহমান রিপন—কেউই ৪ হাজার ভোটের কোটা পার করতে পারেননি।
শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিয়ে ভোটাররা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করলেও বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর এই জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া স্থানীয় রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বড় দলগুলোর বাইরে ছোট দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট নাকি মেরুকরণ—সেই প্রশ্ন এখন পঞ্চগড়ের চায়ের টেবিলগুলোতে।