জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু মাজারগুলোর ওপর নেমে এসেছে নজিরবিহীন আঘাত। গত ১৭ মাসে সারা দেশে অন্তত ৯৭টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে শত বছরের সুফি ঐতিহ্যের অনেক নিদর্শন আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরে সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, এ সময়ের মধ্যে মোট ১৩৪টি হামলার খবর পাওয়া গেলেও সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে ৯৭টি হামলার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৯৭টি হামলার মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩৬টি এবং চট্টগ্রামে ২৮টি ঘটনা ঘটেছে। জেলা হিসেবে ১৭টি হামলা নিয়ে শীর্ষে রয়েছে কুমিল্লা। এ ছাড়া বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে ৬টি মাজার।
ক্ষত ও হাহাকার:
হামলাগুলো কেবল ইট-পাথরের কাঠামোর ওপর নয়, আঘাত হেনেছে মানুষের বিশ্বাসের জায়গায়। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৪৬৮ জন। ৪৪টি মাজার বর্তমানে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, যেখানে একসময় হাজারো মানুষের জমায়েত হতো, সেখানে এখন কেবল নিস্তব্ধতা।
হামলার নেপথ্যে:
গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৯টি হামলার মূল কারণ ছিল ধর্মীয় মতবিরোধ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও স্থানীয় বিরোধের জেরেও ঘটেছে অনেকগুলো হামলা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তত ২৩টি ঘটনায় নির্দিষ্ট ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি হামলার আগে মাইকিং করা হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মাকাম।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা:
প্রতিবেদনে বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার তথ্যও উঠে এসেছে। এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামও এসেছে বিভিন্ন হামলার ঘটনায়।
মাকামের সমন্বয়ক মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, “আমরা কেবল ধ্বংসের চিত্র তুলে ধরছি না, বরং এই ক্ষত কাটিয়ে ওঠার উপায় খুঁজছি।” প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মাজারগুলোর সংস্কার এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে দেশের ১২টি প্রধান রাজনৈতিক দলকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা তাদের আগামী নির্বাচনী ইশতেহারে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে।
মাজারগুলো কেবল ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং এ দেশের হাজার বছরের সহনশীলতা ও আধ্যাত্মিক চেতনার প্রতীক। সেই চেতনার ওপর বারবার আঘাত হানার এই সংস্কৃতি দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।