পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন বন্দরের মগবাজার জামে মসজিদে জামায়াতে ইসলামীর নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসী। তাদের দাবি, মসজিদ একটি ধর্মীয় উপাসনালয়, সেখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) এশার নামাজের পর জামায়াতের পক্ষ থেকে মসজিদ প্রাঙ্গণে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে মুসল্লি ও এলাকাবাসী তাতে আপত্তি জানান এবং বৈঠকটি বন্ধ করার চেষ্টা করেন। এ সময় মসজিদ কমিটির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে ছুটে যান পঞ্চগড় জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি ও জামায়াত নেতা মো. আবুল বাশার বসুনিয়া। তিনি বলেন, “ঘটনার দিন এশার নামাজের পর ওই মসজিদে জামায়াতের পক্ষে কোরআন তাফসিরের একটি ক্লাস অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। এ সময় স্থানীয় বিএনপির কিছু লোক মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যাতে মসজিদে জামায়াতের কোনো বৈঠক বা কার্যক্রম না হতে পারে। মসজিদ কমিটি বৈঠকের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে আমরা সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করি এবং সংশ্লিষ্ট বৈঠক স্থগিত করা হয়। এরপরও বিএনপির পক্ষ থেকে আমাদের বিরুদ্ধে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়— আমাদের দলকে ছোট ও বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, অতীতেও ওই মসজিদে চুরির মতো ঘটনা ঘটেছে। এখন সেখানে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হলে এলাকায় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
জামায়াতে ইসলামীর পৌরসভা ৯ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, “মসজিদে পূর্ব থেকেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, সেখানে কোরআন ও হাদিসভিত্তিক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। ঘটনার দিন এশার নামাজের পর আমি মসজিদের সভাপতির সঙ্গে ওই বৈঠক নিয়ে আলোচনা শুরু করি। কিন্তু স্থানীয় বিএনপির কিছু ব্যক্তি এতে আপত্তি জানান এবং বাধা সৃষ্টি করেন। এরই মধ্যে হঠাৎ তারা উচ্চস্বরে চিৎকার ও বিশৃঙ্খলা শুরু করেন। একপর্যায়ে আমাদের মসজিদের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে আমাদের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতি সপ্তাহেই মসজিদে তালিম বা ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, যা মসজিদ কমিটির সভাপতির অনুমতিক্রমেই আয়োজন করা হয়।”
তবে মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন এই দাবি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি তাদের কোনো বৈঠকের অনুমতি দিইনি। ঘটনার দিন জামায়াতের বৈঠক হবে—এমন কোনো তথ্য আমাকে জানানো হয়নি। তারা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈঠক করার চেষ্টা করায় এলাকাবাসী তাৎক্ষণিকভাবে বাধা দেন। এই মসজিদ এলাকাবাসীর, এখানে সব মতের মানুষ নামাজ আদায় করেন। হ্যাঁ, সপ্তাহে একদিন কোরআন ও হাদিসভিত্তিক আলোচনা হয়, তবে সেখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রচার চালানো হয় না।” তিনি আরও বলেন, “ঘটনার দিন স্থানীয় মুসল্লিরা উপস্থিত ছিলেন, কেউ কাউকে অবরুদ্ধ করেনি। পরবর্তীতে জামায়াতের কিছু নেতা এসে পরিস্থিতি শান্ত করেন এবং সবাই মসজিদ ত্যাগ করেন।”
এ বিষয়ে পৌরসভা ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন,“দীর্ঘদিন ধরে এই মসজিদে জামায়াতের নিয়মিত বৈঠক হয়ে আসছে। এ নিয়ে স্থানীয়রা একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছে, কিন্তু বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। ঘটনার দিন মসজিদ কমিটিকে না জানিয়ে সেখানে বৈঠকের আয়োজন করে জামায়াতে লোকজন, যা জানার পর স্থানীয় মুসল্লিরা প্রতিবাদ জানান। পরবর্তীতে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, আমরা তাদের বাধা দিয়েছি এবং অবরুদ্ধ করে রেখেছি—এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।” এর প্রতিবাদে আমরা একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল করেছি। তিনি আরও বলেন,“মসজিদ একটি পবিত্র ধর্মীয় স্থান। এখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সভা বা বৈঠক অনুচিত। মসজিদের পবিত্রতা রক্ষায় এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা জরুরি—যে দলই হোক না কেন।”
ঘটনার প্রতিবাদে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা রাতেই একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। তারা মসজিদে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবি জানান এবং বলেন, “ধর্মীয় উপাসনালয়কে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”