পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় চার বন্ধুর তিল তিল করে গড়ে তোলা একটি চা বাগান মেয়াদের আগেই দখলের অভিযোগ উঠেছে এক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের শালবাড়ি সরদার পাড়া এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগীরা। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে পরিচর্যা করে যখন লাভের মুখ দেখার সময় এলো, ঠিক তখনই ক্ষমতার দাপটে সাব-রেজিস্ট্রিমূলে লিজ নেওয়া জমি ও বাগান জবরদখল করার অভিযোগ উঠেছে সাবেক চেয়ারম্যান রুহুল আমিন প্রধানের বিরুদ্ধে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০১৬ সালে দেবীগঞ্জ পৌরসভার মধ্যপাড়া এলাকার ফাহমিদ আল ফরিদ, তাসরিফুল ইসলাম তমু, মমতাজুল আহসান ও আতাউর রহমান নামের চার বন্ধু মিলে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে লিজ নেন দুই একর ৪০ শতক পতিত জমি। মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রুহুল আমিন প্রধান ও তার ভাইদের কাছ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ ২৫ বছরের জন্য এই জমিটি সাব-রেজিস্ট্রি করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বিঘা জমির বার্ষিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল সাড়ে আট হাজার টাকা, যা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ১০ শতাংশ হারে বাড়ার কথা ছিল।
জমিটি যখন লিজ নেওয়া হয়, তখন সেটি ছিল ঝোপঝাড়ে ভরা এবং চাষের অনুপযোগী। লিজগ্রহীতারা অনেক অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে জঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানে চা বাগান গড়ে তোলেন। ২০১৮ সালের ভয়াবহ বন্যা এবং পরবর্তী সময়ে করোনা মহামারীর প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চায়ের দাম না থাকলেও তারা নিয়মিত জমির ভাড়া পরিশোধ করে আসছিলেন। বর্তমানে কাঁচা চা পাতার বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় যখন লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই লিজের শর্ত ভঙ্গ করে বাগানটি দখলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী লিজগ্রহীতা তাসরিফুল ইসলাম তমু আক্ষেপ করে জানান, তারা চার বন্ধু মিলে অনেক কষ্টে বাগানটি তৈরি করেছেন। চেয়ারম্যান প্রথমে অতিরিক্ত টাকা দাবি করেছিলেন, যা তারা দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু পরে তিনি আর টাকা নেননি। হঠাৎ করেই একদিন চেয়ারম্যান তার বাহিনী নিয়ে বাগানটি দখল করে নেন এবং লিজগ্রহীতাদের বাগানে প্রবেশ করতে বাধা দেন। এমনকি বাগানে যাওয়ার চেষ্টা করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের কাছে সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে জমি দখলের অভিযোগ স্বীকার করেও অদ্ভুত সব যুক্তি দিয়েছেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রুহুল আমিন প্রধান। তিনি দাবি করেন, লিজগ্রহীতারা বাগানের আম গাছ থেকে তাকে আম দেন না এবং বাগানে পিকনিক করলে তাকে দাওয়াত দেন না। এছাড়া বোনের অসুস্থতার কথা বলে ৪০ হাজার টাকা দাবি করলে তা সময়মতো না পাওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে জমি ও বাগান দখলে নিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের আর জমিতে যেতে দেওয়া হবে না এবং তারা যা খুশি করতে পারে।
স্থানীয় শ্রমিকরা জানিয়েছেন, এই জমিটি একসময় পরিত্যক্ত ছিল এবং তমুসহ অন্যরা অনেক পরিশ্রম করে এখানে প্রাণের সঞ্চার করেছেন। হঠাৎ করে লিজের চুক্তি ভেঙে বাগান দখল করাকে শ্রমিকরা অমানবিক ও প্রতারণামূলক কাজ হিসেবে দেখছেন।
বোদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোয়েল রানা এই বিষয়ে জানান, বিষয়টি নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। লিজের চুক্তির বিষয় হওয়ায় ভুক্তভোগীদের আদালতের আশ্রয় নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিরোধপূর্ণ বাগানের চা পাতা বিক্রির টাকা উভয় পক্ষের সম্মতিতে থানায় জমা আছে। আগামী ১৮ তারিখ উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি সমঝোতা বৈঠকের কথা রয়েছে, যেখান থেকে আইনি ও মানবিক সমাধানের পথ খোঁজা হবে। তবে লিজগ্রহীতাদের দাবি, যে বাগান তারা পরম মমতায় বড় করেছেন, সেখান থেকে তাদের এভাবে উচ্ছেদ করা চরম অন্যায়।