আই জামান চমক, icrbd24: রাত তখন কতটা গভীর ছিল জানি না। ঘুমিয়ে ছিলাম। কিন্তু যারা জেগে ছিলেন, তারা দেখলেন একটা লাইভ চলছে। স্ক্রিনের এপাশ থেকে একজন মানুষ বেশ কয়েকবার আমার নাম নিয়ে কিছু বললেন। গালি দিলেন। তাচ্ছিল্য করলেন। আর বললেন, চমককে চিনি না পর্যন্ত।
সেই কথাটা শুনে আমি হাসলাম। সত্যিই হাসলাম।
কারণ “চিনি না” কথাটা কখনো কখনো যার সম্পর্কে বলা হয় তাকে ছোট করে না, বরং যে বলে তার সীমানাটা স্পষ্ট করে দেয়।
ষোলো বছর ধরে এই পেশায় আছি। সারাদেশের সংবাদ আসে, দেখতে হয়, সম্পাদনা করতে হয়, প্রকাশ করতে হয়। এই দীর্ঘ পথে অনেককে দেখেছি আসতে, দেখেছি যেতে। যাদের হাত ধরে একদিন সাংবাদিকতার প্রথম পদক্ষেপ, তারা আজ দেশের নামকরা মিডিয়ায় কাজ করছেন। তারা আমাকে চেনেন। দেশের অনেক সিনিয়র সাংবাদিক, সম্পাদক আমাকে স্নেহ করেন। এটা আমি বলছি না, এটা সময়ের স্বীকৃতি।
কবিতা পড়ি লাইভে হাজার হাজার কবির কবিতা পাঠ করেছি। কত রাতে মাইক্রোফোনের সামনে বসে কবির কণ্ঠ হয়েছি। কত মানুষ সেই মুহূর্তগুলো বুকে রেখেছেন, সেটা আমি জানি। সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, কবিতা, এই পথে হেঁটেছি কৈশোর থেকে। কেউ পথ দেখিয়ে দেননি বেশিরভাগ সময়, নিজেই হেঁটেছি।
তিনি চেনেন না। ঠিক আছে।
কিন্তু তিনি চাইলেই পারতেন। হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ। ম্যাসেঞ্জারে একটা নক। “ভাই, এই লেখাটা লিখলেন কেন” বলে জিজ্ঞেস করতে পারতেন। সেটাই কি সাংবাদিকতার পথ নয়? সেটাই কি মানুষের পথ নয়? কিন্তু তিনি সেই পথে হাঁটেননি। লাইভে গেলেন। গালি দিলেন। বললেন চিনি না।
এই আচরণটা আসলে কিসের প্রকাশ?
কাশিমপুরের সেই ঘটনাটার কথা মনে করুন। আলিয়া আক্তার মার খেলেন, থানায় গেলেন, মামলা নিল না। সালাম দেওয়ান পাশে দাঁড়ালেন মীমাংসার জন্য, আসামি হলেন। আর ওসি জানালেন, “সীমান্ত সাহেবের সঙ্গে কথা বলুন।” এই ছবিটার কথা লিখেছিলাম। শুধু এটুকুই লিখেছিলাম।
এই লেখাটা তিনি সহ্য করতে পারলেন না। এই একটাই তথ্য যথেষ্ট।
যে কথা সত্য, সেটা মানুষকে কখনো কখনো ভেতর থেকে কাঁপায়। কাঁপানো মানুষ শান্ত থাকতে পারে না। তখন গলা উঠিয়ে “চিনি না” বলে নিজেকে বড় মনে করার চেষ্টা করে। কিন্তু চিৎকার করলেই মানুষ বড় হয় না। লাইভ করলেই সত্য মুছে যায় না।
আমার বিরুদ্ধে তিনি যা বললেন, সেগুলো আমি আর বলতে চাই না। যেখানে পচন ধরেছে সেদিকে বারবার তাকালে চোখ নোংরা হয়। শুধু এটুকু বলব, আমার কোনো কলামে একটিও মিথ্যা তথ্য নেই। একটিও উদ্ভাবিত তথ্য নেই। যা লিখেছি, কাগজে আছে, প্রমাণে আছে।
আর এই কারণেই গালি এসেছে।
রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন মিথ্যা কখনো শান্তভাবে থাকে না, সে সব সময় চিৎকার করে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। সত্য চুপ করে থাকে। কারণ সত্যের কোনো প্রমাণের দরকার পড়ে না।
সেই কথিত সাংবাদিকের জন্য আমার কোনো ক্রোধ নেই। সত্যি বলছি। করুণাও নেই। শুধু একটু বিস্ময় আছে। পনেরো ঘণ্টা রাত জেগে লাইভ করে একজন মানুষকে থামানোর চেষ্টা করতে হয় যখন, তখন বুঝতে হবে সেই মানুষের কলমের জোর কোথাও লাগছে।
আমার শুভকামনা তাঁর জন্য।
কিন্তু সালাম দেওয়ানের মতো মানুষদের জন্য আমার কলম থামবে না। তাদের জন্য থামবে না, যারা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে মামলার আসামি হন। থামবে না তাদের জন্য, যারা ভাবছেন কেউ লিখছে না, কেউ দেখছে না। লিখছি। দেখছি।
চমককে না চিনলেও ক্ষতি নেই। সত্যকে চিনুন। সেটাই যথেষ্ট।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839