• সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম
মিঠাপুকুরে বিষাক্ত মদপানে চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় প্রধান আসামিসহ দুই ভাই আশুলিয়া থেকে গ্রেফতার তারাগঞ্জে পল্লীবিদ্যুৎ কর্মী হত্যা মামলার প্রধান আসামি মহাব্বত আলী সাভার থেকে গ্রেফতার পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালানোর চেষ্টা, অবশেষে ২৫ বোতল এসকাফসহ ধরা পড়লেন কুড়িগ্রামের তরুণ সাধারণ থেকে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির শীর্ষ নেতৃত্বে ফাইট ডিরেক্টর আরমান ছাগল বাঁধাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে প্রাণ হারালেন সুধীর চন্দ্র, স্বজনদের আহাজারি বীরগঞ্জে ১০ লাখ টাকার ইয়াবাসহ কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী জয়নাল গ্রেফতার বীরগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানে সাজাপ্রাপ্ত চারজন কারাগারে, অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা জেলা পুলিশ সুপারদের ওপর ত্রিমুখী নজরদারি: গোয়েন্দা, স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ সদর দপ্তর ডোমার কেতকীবাড়ীতে টাকা লেনদেনের দ্বন্দ্বে মারপিট, সাবেক ইউপি সদস্য গ্রেফতার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সততার বার্তা নিয়ে পীরগাছা থানায় রংপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

সাধারণ থেকে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির শীর্ষ নেতৃত্বে ফাইট ডিরেক্টর আরমান

বিনোদন ডেস্ক
সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

গুলিস্তানের ব্যস্ত ফুটপাত। চারদিকে ধুলোবালি, বাসের হর্ন, হকার আর যাত্রীদের চিরচেনা কোলাহল ও ভিড়। চার দশক আগের সেই ধুলোমলিন পরিবেশে এক সাধারণ তরুণ বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছিলেন। চোখে ছিল অফুরন্ত সম্ভাবনার দীপ্তি, কিন্তু জীবন কোন পথে এগোবে তা ছিল সম্পূর্ণ অজানা। সেই সাধারণ তরুণের নাম আরমান। তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করা এই ছেলেটিই একদিন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম প্রভাবশালী ও সফল ব্যক্তিত্বে পরিণত হবেন।

সাফল্যের এই চূড়ায় পৌঁছানোর পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। সত্তরের দশকে সায়েদাবাদ ও গুলিস্তান এলাকায় ছোটখাটো ব্যবসা করে কোনোমতে দিন কাটত আরমানের। বড় কোনো স্বপ্ন দেখার সুযোগ তখন তাঁর ছিল না। তবে ১৯৭৬ সালে গুলিস্তানের সেই ফুটপাতেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়টি আসে। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় তৎকালীন জনপ্রিয় খলনেতা ও ফাইট ডিরেক্টর জসিমের জ্যাম্বস ফাইটিং গ্রুপের সদস্য টাকলা নূর ইসলামের সঙ্গে। এই একটি পরিচয় আরমানের জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। নূর ইসলাম তাঁকে জসিমের অফিসে নিয়ে যান এবং সেখান থেকেই শুরু হয় রূপালী পর্দায় তাঁর দীর্ঘ, যন্ত্রণাদায়ক ও বিস্ময়কর এক জীবনযুদ্ধ।

জসিমের ফাইটিং গ্রুপে তখন প্রায় ৩০০ জন পেশাদার সদস্য কাজ করতেন। তাদের বিশাল ও শক্তপোক্ত শারীরিক গড়নের মাঝে আরমান ছিলেন তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে ছোটখাটো। কিন্তু শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তাঁর ভেতরের অদম্য মনোবলকে কখনো দমাতে পারেনি। শুটিংয়ের মাঠে কখনো হাতে ভারী বল্লম, কখনো বাঁশ, আবার কখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক স্টান্ট করার মতো কঠিন দায়িত্ব তাঁর ওপর আসত। প্রতিটি কাজই তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা ও সাহসের সঙ্গে সম্পন্ন করতেন। মূল নায়ক-নায়িকাদের ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যে আড়ালে থেকে জীবন বাজি রেখে কাজ করা স্টান্টম্যান বা ডামি হিসেবেই চলচ্চিত্রে তাঁর পথচলা শুরু হয়। সেই দিনগুলোতে পদে পদে অপমান ছিল, তীব্র কষ্ট ছিল এবং ছিল ভবিষ্যতের চরম অনিশ্চয়তা। কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র তিনি ছিলেন না। নিজের কঠোর পরিশ্রম, নিখুঁত কর্মদক্ষতা এবং অমায়িক বিনয়ের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে সবার প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন এবং একপর্যায়ে জসিমের প্রধান সহকারী হিসেবে পদোন্নতি পান।

পরবর্তী সময়ে জসিমের প্রধান সহকারী ফাইট ডিরেক্টর মুসলিম যখন স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করেন, তখন আরমান তাঁর সঙ্গেও প্রধান সহকারী হিসেবে যুক্ত হন। এই দুই প্রখ্যাত গুরুর কাছ থেকেই তিনি চলচ্চিত্রের নিষ্ঠা, কঠোর শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের মূল পাঠ গ্রহণ করেন। বছরের পর বছর ধরে অর্জিত এই অভিজ্ঞতা এবং নিজের ওপর অগাধ বিশ্বাস তাঁকে একসময় সম্পূর্ণ নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। সহকারী থেকে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন একজন স্বতন্ত্র ও পুরোদস্তুর ফাইট ডিরেক্টর।

নিজের কাজের প্রতি এই গভীর ভালোবাসা তাঁকে আরও এক সাহসী পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করে, আর তা হলো চলচ্চিত্র প্রযোজনা। দীর্ঘ চলচ্চিত্র জীবনের অর্জিত জ্ঞান, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীল ভাবনার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি নির্মাণ করেন শান্ত কেন মাস্তান নামের একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। মুক্তি পাওয়ার পর ছবিটি দেশজুড়ে ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করে এবং তৎকালীন চলচ্চিত্র বাজারে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করে। যে মানুষটি একদিন ফুটপাতে বসে যৎসামান্য আয়ের জন্য সংগ্রাম করতেন, তিনি নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত ও সফল একজন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত হন। এরপর তিনি বাদশা কেন চাকর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। যোগ্যতার ধারাবাহিকতায় তিনি ক্রমে অর্জন করেন এক অনন্য গৌরবময় পরিচয়। তিনি পরিচিতি পান বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের এক নম্বর ফাইট ডিরেক্টর এবং মাস্টার অব ক্রিয়েটিভ ফাইট ডিরেক্টর হিসেবে।

লড়াই ও সংগ্রাম যেন আরমানের জীবনের অপর নাম। তাঁর প্রতিটি সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে অগণিত বিনিদ্র রাত, চরম ত্যাগ ও কঠোর অধ্যবসায়। শুধু কাজের ক্ষেত্রেই নয়, সহকর্মীদের হৃদয়েও তিনি বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে তিনি যখনই যে পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, সাধারণ ভোটাররা তাঁকে বিপুল ভোটে জয়ী করেছেন। এর মূল কারণ তাঁর সুখে-দুঃখে পাশে থেকেছেন শত শত ফাইটার, চরিত্র অভিনেতা, নৃত্যশিল্পী এবং সিনিয়র শিল্পীরা। তাঁরা আরমানকে শুধু একজন প্রার্থী হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযাত্রী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরম আস্থার মানুষ হিসেবে।

চলচ্চিত্রের সেই প্রান্তিক ও সাধারণ শিল্পীদের মধ্য থেকে উঠে আসা আরমান এবার শিল্পী সমিতির সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা চলচ্চিত্র অঙ্গনের ইতিহাসে একটি অনন্য ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই নির্বাচনী লড়াইয়ে তাঁর পাশে অভিভাবক হিসেবে রয়েছেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী আনোয়ারা এবং সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হিসেবে যুক্ত হয়েছেন চাঁদের আলো চলচ্চিত্র খ্যাত জনপ্রিয় নায়িকা মুক্তি। যাঁদের শৈশব, কৈশোর ও পুরো জীবন এই চলচ্চিত্র অঙ্গনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে, তাঁরাই আজ এই শিল্পের সার্বিক নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

শূন্য থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর এই অবিশ্বাস্য গল্পটি কোনো কাল্পনিক সিনেমার চিত্রনাট্য নয়। এটি একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তনের এক জীবন্ত বাস্তব উপাখ্যান। আরমান নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, দায়িত্ববোধ, সততা, নিষ্ঠা ও অদম্য ইচ্ছা থাকলে পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছুই থাকে না। স্বপ্ন যদি হৃদয়ের গভীরে সত্য হয়ে জ্বলে, তবে প্রতিকূলতার মেঘ কেটে আলোর পথ একদিন তৈরি হবেই।

নির্বাচনের এই তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্যেও আরমান তাঁর সহজাত সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার পরিচয় দিতে ভোলেননি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতি আন্তরিক শুভকামনা জানিয়ে তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীলভাবে বলেন যে, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সবাই আসলে একই পরিবারের সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ শিল্পীদের পাশে থাকার কারণে এই অঙ্গনের কোথায় সংস্কার প্রয়োজন এবং কোন সমস্যার সমাধান হলে শিল্পীরা ভালো থাকবেন, তা তিনি খুব কাছ থেকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। তিনি জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব শিল্পীকে একসঙ্গে নিয়ে তাদের অধিকার রক্ষা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশা পূরণে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। সংগ্রাম থেকে সাফল্য এবং সাফল্য থেকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার এই মানসিকতাই আরমানকে সবার কাছে অনন্য করে তুলেছে। রূপালী পর্দার পেছনের এই লড়াকু নায়ক এখন সবার দোয়া ও ভালোবাসায় এক নতুন বিজয়ের স্বপ্ন দেখছেন।


More News Of This Category