পঞ্চগড়ের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর আগামীর স্বপ্ন যেন একবিন্দুতে এসে মিলেছে। সোমবার দুপুরে পঞ্চগড় পৌরসভার তুলার ডাঙ্গা গ্রামে আয়োজিত এক আবেগঘন নির্বাচনী উঠান বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক এবং ১১ দলীয় জোটের শাপলাকলি মার্কার প্রার্থী সারজিস আলম এক হুঙ্কার দিলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, ভয়-ভীতি কিংবা মিথ্যে মামলার রাজনীতি আর চলবে না; বরং ব্যালট পেপারের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষ সমস্ত জুলুমের এক ‘নীরব বিপ্লব’ ঘটাবে।
উঠান বৈঠকে সারজিস আলম তার বক্তৃতায় সাধারণ মানুষের বর্তমান অবস্থাকে খুব দরদ দিয়ে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “মানুষ এখন আর মিথ্যে আশ্বাস চায় না। মানুষ চায় শান্তি ও নিরাপত্তা। আমরা এমন একটি ঐক্যবদ্ধ জোট গঠন করেছি, যারা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী কঠিন সময়েও সাধারণ মানুষের ওপর কোনো জুলুম বা চাঁদাবাজি করেনি। সাধারণ মানুষের এই যে আস্থা, এটাই ইনশাআল্লাহ ব্যালটের মাধ্যমে নীরব বিপ্লবে রূপ নেবে।”
বিগত দিনে যারা বারবার ক্ষমতায় থেকেও জনগণের বিপদে পাশে দাঁড়ায়নি, তাদের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, “যাদের বিপদের সময় হারিকেন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায়নি, মানুষ তাদের ওপর আর কেন আস্থা রাখবে? দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্টে যারা ছায়ার মতো পাশে ছিল, এ দেশের তরুণ প্রজন্ম এখন তাদের পক্ষেই দাঁড়াবে।”
সারজিস আলম তার বক্তব্যে পঞ্চগড়সহ পুরো দেশের জন্য একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন আগামীর রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, তাদের জোট ক্ষমতায় গেলে প্রশাসন ও রাজনীতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে। প্রত্যেক নাগরিকের সমান বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে মাদকের বিরুদ্ধে তিনি এক সামাজিক যুদ্ধের ঘোষণা দেন।
তবে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতেও ভুলেননি তিনি। অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “আমাদের কর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে, বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভোটের পরে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই সংস্কৃতি আমাদের বদলাতে হবে।” তিনি সব দলকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলার আহ্বান জানান।
বক্তব্যের শেষ দিকে প্রবাসে বসে দেশের ভাগ্য নির্ধারণের চেষ্টার কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, “কারও ইশারায় বা অন্য কোনো এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাগ্য এখন আর নির্ধারিত হবে না। শেখ হাসিনা ভারতে বসে দেশের সিদ্ধান্ত নেবেন—সেই দিন ফুরিয়ে গেছে। মনে রাখবেন, যে তরুণ প্রজন্ম অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, তারা কিন্তু ঘুমিয়ে পড়েনি। প্রয়োজন হলে তারা আবারও রাজপথে নামতে প্রস্তুত।”
তুলার ডাঙ্গা গ্রামের সেই উঠান বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত কেবল এক নির্বাচনী সভায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা রূপ নিয়েছিল সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের এক ঐক্যবদ্ধ শপথে।