পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার ৩নং সদর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের খয়েরবাগান চর তিস্তাপাড়া এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে গভীর রাতে মোশারফ-আছমা দম্পতির ৫০ শতক জমির চা বাগানের প্রায় তিন হাজার গাছ কেটে নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মোশারফের স্ত্রী আছমা দেবীগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ (এজাহার) দায়ের করেছেন। এজাহারে ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও ১৫–২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী বাদী মোছাঃ আছমা আক্তার (৩৭) জানান, তিনি ও তার স্বামী মোঃ মোশারফ হোসেন পৈত্রিক ও ক্রয় সূত্রে প্রাপ্ত জমিতে দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছেন। ওই জমিতে প্রায় ৮ বছর বয়সী প্রায় ৩ হাজার চা গাছ রোপণ করা ছিল। এজাহার সূত্রে জানা যায়, জমিটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে বিরোধ চলছিল এবং এ বিষয়ে আদালতে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। গত ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ দিবাগত গভীর রাতে (২৭ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ১২টা ৪০ মিনিটে) অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্রসহ বাদীর ভোগদখলীয় জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে চা গাছ কেটে ও ভেঙে ফেলে।
মোশারফ-আছমা দম্পতির দাবি, এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ঘটনার সময় আছমা ও তার স্বামী মোশারফ বাধা দিতে গেলে অভিযুক্তরা তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়।
ঘটনায় অভিযুক্ত রাহলেন, সদর ইউনিয়ন ২নং ওয়ার্ড খয়েরবাগান চরতিস্তাপাড়া এলাকার মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে মোঃ ফরিদুল ইসলাম (৪০), মৃত মন্তাজ আলীর ছেলে মোঃ ইউসুফ আলী (৩৫), মোঃ তজমান আলীর ছেলে মোঃ রফিকুল ইসলাম (৪৬), মৃত মকবুল হোসেনর ছেলে মোঃ ফজলুল হক (৩৭), –মোঃ রফিকুল ইসলামের ছেলে মোঃ সাগর (২৫), মৃত হামিদ আলীর ছেলে মোঃ জনাব আলী (৫০), মোঃ জনাব আলীর স্ত্রী মোছাঃ ছকিনা বেগম (৪৫), মোঃ ইউসুফ আলীর স্ত্রী মোছাঃ জমিলা বেগম (৩০), মোঃ রফিকুল ইসলামের স্ত্রী মোছাঃ জরিনা বেগম (৪২), মোঃ ফজলুল হকের স্ত্রী মোছাঃ সূর্যবানু (৩৫), মোঃ ফরিদুল ইসলামের স্ত্রী মোছাঃ তাসলিমা বেগম (৩৮), সকলের সাং–খয়েরবাগান চরতিস্তাপাড়া।
তফশীলঃ জেলা-পঞ্চগড়, থানা-দেবীগঞ্জ, মৌজা-উপেন চৌকি ভাজনী, জে,এল, নং-৫৩, খতিয়ান নং-১৫৬, দাগ নং-৩৯, সর্বমোট জমির পরিমান ১ একর ১৭ শতক এর মধ্যে ৫০ শতক এর উপরে বর্ণিত ঘটনা।
পূর্বে চা বাগানের জমি নিজেদের মালিকানা দাবি করে মৃত-ইদ্রি আলীর ছোলে আব্দুল জব্বার ও বর্তমান অভিযুক্তরা হামলার অভিযোগে ৩নং সদর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি আব্দুল জব্বারকে সাময়িকভাবে পদ থেকে স্থগিত করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল সদর ইউনিয়ন।
পূর্বে ২৬/৬/২০২৫ ইং তারিখে স্থানীয় আমিন সার্ভার সুলতান ও শফিউল আলমের মাধ্যমে তফশীল অনুযায়ী, জেলা পঞ্চগড়, থানা দেবীগঞ্জ, মৌজা উপেন চৌকি ভাজনী, জে.এল. নং-৫৩, খতিয়ান নং-১৫৬, দাগ নং-৩৯, মোট ২৬ বিঘা জমি ছিল। বর্তমানে মোফাজ্জল হোসেন মোকার দখলে ৭১ শতক জমি অবশিষ্ট রয়েছে। স্থানীয়দের সালিশে জমি দেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও বৃদ্ধ ফজল হক তা মেনে নেননি।
বৃদ্ধ ফজল হকের দুই বিঘা জমি নিয়ে আব্দুল জব্বারসহ ওই এলাকার ৮ জন বায়না দলিল প্রস্তুত করে মোশারফ ও আছমা দম্পতির দখলকৃত চা বাগান জব্বার গং দখলের চেষ্টা শুরু করেন। জব্বারের পক্ষের দাবি অনুযায়ী ফজল হক এই জমিটি মোশারফ ও আছমা দম্পতির চা বাগানের জমি দাবি করেন। স্থানীয় সালিশে সমাধান না হওয়ায় বিরোধ অব্যাহত থাকে। শেষ পর্যন্ত মোশারফ ও আছমা দম্পতি আদালতের সহায়তা নেন এবং জব্বার গং-এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। উভয় পক্ষের মামলা বর্তমানে আদালতে চলমান রয়েছে।
পূর্বের বিরোধের পর থেকেই আসমা-মোশারফ দম্পতির চা বাগানের তিনবারের পাতা কাটার টাকা বিচারকদের হাতে ও ফ্যাক্টরিতে জমা আছে বলে জানা যায়।
২০০৬ সাল থেকে মোশারফ-আছমা দম্পতি উক্ত জমি ভোগদখলে রয়েছেন। ২০১৮ সালে তারা সেই জমিতে চা-বাগান তৈরি করেন।
মোশারফ-আছমা দম্পতি জানান, এই চা-বাগান থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তারা সংসার চালানো ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ মেটাতেন। কিন্তু প্রতিপক্ষের হামলায় এই সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাদের সংসারে দুর্ভোগ নেমে আসবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
পূর্বের ঘটনায় জব্বার গংয়ের বিরুদ্ধে স্থানীয়রা মোশারফ-আছমা দম্পতির পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বর্তমান ঘটনায় কেউই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, মোশারফ-আছমা দম্পতির ওপর বর্তমানে ও অতীতে যে নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা আমরা প্রকাশ্যে বলতে না পারলেও আল্লাহর কাছে এর বিচার প্রার্থনা করি। এ ধরনের অপরাধীদের যদি এই দুনিয়ায় বিচার না হয়, তবে আল্লাহ যেন তাদের বিচার করেন-এই কামনাই করি। আমরা প্রশাসনের কাছে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।প্রশাসনের নিরব ভূমিকার কারণেই অপরাধীরা বারবার এ ধরনের অপরাধ করার সুযোগ পাচ্ছে। প্রশাসন যদি কঠোর ভূমিকা নিত, তাহলে অপরাধীরা এ অপরাধ করার সুযোগ পেত না-এমনটাই তারা জানায়।
এ বিষয়ে জানতে জব্বারের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কল রিসিভ না করায় তার মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে বাদী আছমার দায়ের করা এজাহারে উল্লেখিত প্রধান অভিযুক্ত ফরিদুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আছমা-মোশারফ দম্পতির চা বাগানে কী ঘটেছে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেন না। তিনি জানান, সকালে ঘুম থেকে উঠে তাদের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনেছেন। এছাড়া তিনি দাবি করেন, রাতে পেটের ব্যথার কারণে তিনি অসুস্থ ছিলেন। আব্দুল জব্বারের বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, জব্বার বাড়িতে নেই। তিনি কয়েক দিন আগে ইটভাটায় কাজের উদ্দেশ্যে চলে গেছেন।
পূর্বের বিরোধের ঘটনায় ৮/১০/২০২৫ ও
১০/১০/২০২৫ ইং তারিখে দুইটা মামলা করে মোশারফ-আছমা দম্পতি এ মামলা দেবীগঞ্জ থানায় তদন্ত দিন রয়েছে।
দেবীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কে. এম. মনিরুজ্জামান চৌধুরী,অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ভুক্তভোগী থানায় একটি এজাহার দিয়েছেন। মামলার দায়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।