পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে গণঅভ্যুত্থান–২০২৪–এ আহত ব্যক্তিদের জন্য প্রস্তুতকৃত জুলাই যোদ্ধা তালিকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হচ্ছে, দেবীগঞ্জ পৌর শহরের উত্তরপাড়া এলাকার রেজাউল করিমের ছেলে জুবায়ের ইসলাম (তাকদীর) ভুয়া তথ্য প্রদান করে ওই তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
জুবায়ের ইসলামের গেজেট নম্বর ১০২০ এবং মেডিকেল কেস আইডি ১৩৮৭৮।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দেবীগঞ্জ পৌর শহরে সরকারি জায়গায় দোকানের জায়গা দখল কেন্দ্র করে মাইক্রোবাস স্ট্যান্ডের জামালদের সঙ্গে বিরোধের সময় হাতাহাতির ঘটনায় জুবায়ের আহত হন। কিন্তু ৪–৫ আগস্ট কিংবা জুলাইয়ের আন্দোলন সংশ্লিষ্ট কোনো সংঘর্ষে তার আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তবুও ছাত্র আন্দোলনের জুলাইয়ের সংঘর্ষে আহত দেখিয়ে তাকে জুলাই যোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ৬–৭ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সেখানে চিকিৎসা নেন জুবায়ের।
দেবীগঞ্জ উপজেলা থ্রি-হুইলার পাগলু সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ জামাল উদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের সামনে দোকানের জায়গা নিয়ে জুবায়েরের চাচা রফিকের সঙ্গে আমাদের বিরোধ হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতির সময় জুবায়েরের বাম হাতের আঙুল এবং মাথায় আঘাত লাগে। পরে রফিক থানায় অভিযোগ করলেও সেটি সমাধান হয়ে যায়। তবে জুবায়ের জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনে আহত হয়েছিল-এমন কোনো তথ্য আমরা জানি না।
এ ঘটনায় সমালোচনা উঠেছে যে, জুলাই মাসে আহত না হলেও জুবায়ের সরকার ঘোষিত সুবিধা গ্রহণ করেছেন।
জুবায়ের ইসলাম ও ওয়াসিম আকরাম জুলাইয়ের যোদ্ধা সম্পর্কে মোবাইলে এক কল রেকর্ডে জুবায়ের বলেছেন, আমি কীভাবে জুলাইয়ের আহত তালিকায় এলাম, নিজেও জানি না। যারা তালিকা করেছেন, তারাই আমাকে ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
এই বিষয়ে গণমাধ্যম কর্মীরা জুবায়েরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রথমে বলেন যে পরে কথা বলবেন, তবে পরে তিনি আর কোনো যোগাযোগ করেননি এবং মন্তব্য দিতে রাজি হননি।
দেবীগঞ্জে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১৬ জুলাই এন.এন. স্কুল (নৃপেন্দ্র নারায়ণ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে খালিদ মাহমুদ সৈকত ও ওয়াশিশ আলমের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের হয়। পরদিন ১৭ জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণের অভিযোগে পুলিশ রাতে তাদের গ্রেপ্তার করে। তাদের গ্রেপ্তারের পর দেবীগঞ্জে প্রকাশ্যে মিছিল বন্ধ হলেও ছাত্র ও রাজনৈতিকভাবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং গণধিকার পরিষদের স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে আন্দোলন সীমিত আকারে চলতে থাকে। ৪ আগস্টের আন্দোলনের পর দেবীগঞ্জের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পালায়ন শুরু হয়। ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর এলাকায় আনন্দ মিছিল বের হয়।
জুবায়েরের প্রসঙ্গে সৈকত ও ওয়াশিশ বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণে ১৭ জুলাই আমরা জেলে যাই এবং ৬ আগস্ট কারামুক্ত হই। তাই পুরো জুলাই মাসের ঘটনা আমাদের পর্যবেক্ষণে ছিল না। এখন দেখা যাচ্ছে, জুবায়েরের আহত হওয়ার ঘটনাটি জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এটি জমি–সংক্রান্ত ব্যক্তিগত বিরোধের ফল। তবুও সেই আহত হওয়াকে জুলাই যুদ্ধের ঘটনা হিসেবে দেখিয়ে গেজেটে নাম উঠেছে- যা প্রতারণা। এ বিষয়ে প্রশাসনের আরও গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করা উচিত ছিল। আমরা চাই, যদি সে ভুয়া তথ্য দিয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, তবে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী আল আমিন খন্দকার উল্লেখ করেছেন যে, জুলাই আন্দোলনের সময় ১৭ জুলাই দেবীগঞ্জ থেকে ওয়াসিস এবং সৈকতকে গ্রেফতার হওয়ার পরে ছাত্ররা বারবার রাস্তায় নামতে চেয়েও চাপের কারণে সরাসরি অংশ নিতে পারেনি। কিন্তু ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নামেন এবং সেদিনই আওয়ামী ফ্যাসিস্ট পলান শুরু হয়। পরের দিন, ৫ আগস্ট, সরকার পতনের মাধ্যমে আন্দোলন শেষ হয়। জুবায়েরও আন্দোলনে উপস্থিত ছিলেন, তবে তিনি কোনো ধরনের আহত হননি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট থেকে জানা গেছে, দেবীগঞ্জে জুলাই আন্দোলনের আহতদের তালিকায় কিছু ভুয়া নাম অন্তর্ভুক্ত আছে। এটি শুনে আমরা হতবাক হই । আমাদের আহত ব্যক্তিদের মধ্যে এমন ভুয়া তালিকাভুক্তি অগ্রহণযোগ্য। আমরা চাই সঠিকভাবে তদন্ত করে যথাযথ তালিকা তৈরি করা হোক। এছাড়া আহতদের তালিকা তৈরির সময় কর্তৃপক্ষ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।
জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ওয়াসিম আকরাম বলেন, সারা দেশে নয়, ২৪ জুলাইয়ের আন্দোলনে ৪ আগস্ট দেবীগঞ্জে আওয়ামী লীগের পালায়ন শুরু হয় এবং ৫ আগস্ট আন্দোলনের মাধ্যমেই ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে- জুবায়ের ইসলাম জুলাই আন্দোলনের জুলাই যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় জুলাইযোদ্ধারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করলেও জুলাই আন্দোলনে কোনো ধরনের আহত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে তিনি যুক্ত নন। ব্যক্তিগত জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের ঘটনায় আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি তথ্য গোপন রেখে জুলাই যুদ্ধের আহত তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং সরকারের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার আবু নোমান মোঃ ইফতেখারুল তৌহিদ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গেজেটভুক্ত তালিকায় দেবীগঞ্জ উপজেলার ছয়জনের নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজনের হাসপাতালভর্তির তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি জানান, জুবায়ের ইসলাম ৬ আগস্ট দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে হাতে ও মাথায় আঘাত পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। একই দিন বিকেলে তানভীরও ভর্তি হন। এর আগে, ৪ ডিসেম্বর মোঃ রবিউল ইসলাম আহত অবস্থায় ভর্তি হন। তবে তালিকাভুক্ত বাকিদের হাসপাতালভর্তির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাহমুদুল হাসান বলেন, জুলাই গেজেট তালিকার যাচাই–বাছাইয়ের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না। সে সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা, জুলাই ছাত্র আন্দোলনের ছাত্র সমন্বয়কসহ অন্যান্য প্রতিনিধিরা। তবে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত তালিকায় ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে কারও নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে তা পুনরায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।