পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ পৌর শহরের নতুন বন্দর এলাকায় করতোয়া নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হচ্ছে কৃষকদের বহু মূল্যবান ফসলি জমি। প্রতিদিন নদীর গ্রাসে চলে যাচ্ছে বিঘার পর বিঘা আবাদী জমি, যা এই অঞ্চলের কৃষকদের সারা বছরের স্বপ্ন। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের এই ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তাঁরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন এবং অদূর ভবিষ্যতে পথে বসার আশঙ্কা করছেন। এই পরিস্থিতি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
দেবীগঞ্জের নদী তীরবর্তী কৃষকরা জানান, প্রতি বর্ষা মৌসুমেই করতোয়া নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন আরও তীব্র হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যা চলে এলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিশেষ করে দেবীগঞ্জ পৌর শহরের নতুন বন্দর সংলগ্ন এলাকা এবং ময়নামতির চর থেকে শুরু করে বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ভাঙন এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এতে বহু পরিবার তাদের শেষ সম্বলটুকু হারাতে বসেছে।
ভুক্তভোগী এক কৃষক, দেবীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আহেদ আলী বলেন, “আমাদের একরের পর একর জমি নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে। আমার দাদার আমল থেকে আমরা এই জমিতে চাষাবাদ করে আসছি। এখন চোখের সামনে সেই জমি নদী গ্রাস করে নিচ্ছে। আমরা দিন দিন নিঃস্ব হয়ে পড়ছি। যদি এখনই কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে আমাদের চাষাবাদ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে এবং আমাদের মতো শত শত পরিবার বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে।”
আহেদ আলীর মতো আরও অনেক কৃষক তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাঁদের দাবি, ময়নামতির চর থেকে নতুন বন্দর এলাকা পর্যন্ত করতোয়া নদীর তীরে যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে, তা এখনই রোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবেশগত ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এই ভাঙন চলতে থাকলে শুধু ফসলি জমি নয়, নদী তীরবর্তী বসতবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়বে। বিগত কয়েক বছরে স্থানীয় প্রশাসন থেকে যেটুকু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ছিল নিতান্তই অপ্রতুল ও অস্থায়ী। বালুভর্তি বস্তা ফেলে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পানির তোড়ে তা টিকছে না। ফলে কৃষকদের জীবন ও জীবিকা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
এদিকে, পরিবেশবিদ এবং পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞরাও এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, নদীভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে শুধু বাঁধ নির্মাণ নয়, বরং নদীর গতিপথ, পানির প্রবাহ এবং ভূ-প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি তীর সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। তাঁদের আশঙ্কা, এখনই ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
এছাড়াও, নদী ভাঙনের ফলে শুধু ফসলি জমি হারানোই নয়, এর প্রভাব পড়ছে পুরো এলাকার জীবনযাত্রায়। চাষাবাদ কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে কৃষি পণ্যের জোগান কমছে, বাড়ছে বেকারত্ব। একসময় যে এলাকা সবুজে আর ফসলে ভরে থাকত, সেখানে এখন শুধুই ধু ধু বালুচর আর ভাঙনের চিহ্ন। স্থানীয় জনগণ মনে করছেন, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এই সমস্যার গুরুত্ব অনুধাবন করা জরুরি এবং দ্রুত স্থায়ী সমাধান করা উচিত।
এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাঙন রোধে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও, সেই আশ্বাস কবে বাস্তবে রূপ নেবে, তা নিয়ে সন্দিহান স্থানীয়রা। তাঁদের প্রশ্ন, প্রতি বছর বর্ষা এলেই কেন এই ভাঙন শুরু হয় এবং কেন বছরব্যাপী স্থায়ী সমাধানের কাজ শুরু হয় না? নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এই মানুষগুলোর জীবন-জীবিকা সুরক্ষার জন্য দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় দাবি।