এবিএম সোহেল রশিদ: বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী ধারার শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকর্মী, সংগীতশিল্পী, চলচ্চিত্রকর্মী, আবৃত্তিশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের এক সমন্বিত ও শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোট। দেশের স্বাধিকার চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এই সংগঠনটি পরিচালিত হয়ে আসছে।
সংগঠনটির ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সংলগ্ন সড়কদ্বীপে এক জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির চেয়ারপারসন ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পরামর্শে এই জোট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রেজাউল করিম তালুকদার এবং সদস্য সচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলান রফিকুল ইসলাম।
যাত্রার চার বছর পর ১৯৯৭ সালের ৭ এপ্রিল তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পরামর্শে জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের প্রথম পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক ও দেশবরেণ্য চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম এবং মহাসচিবের দায়িত্ব পান রফিকুল ইসলাম। দেশবরেণ্য চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম আমৃত্যু অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে গেছেন। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ২০২২ সালের ২৬ নভেম্বর বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শে সংগঠনের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। নতুন এই কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রখ্যাত চিত্রনায়ক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বলকে এবং মহাসচিব পদে রফিকুল ইসলাম পুনর্বহাল থাকেন।
জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোট কেবল নিজস্ব পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দেশের পেশাজীবী আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ গঠনে এই জোট উদ্যোক্তা সদস্য হিসেবে অত্যন্ত অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এবং প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এর একটি প্রধান অন্তর্ভুক্ত সংগঠন হিসেবে কাজ করে আসছে। এই পেশাজীবী পরিষদে অন্য শরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে আইনজীবী ফোরাম, ইউট্যাব বা ইঞ্জিনিয়ার্স ফোরাম, বিএফইউজে বা সাংবাদিক ফোরাম, এ্যাব বা স্থপতি ফোরাম, ড্যাব বা ডাক্তার ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দল, এইবি, শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোট এবং জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটসহ বেশ কয়েকটি সহযোগী পেশাজীবী সংগঠন।
মূলত জাতীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণ, বিকাশ ও প্রসার ঘটানোই এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য। সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র, নৃত্য, আবৃত্তি ও চারুকলার নিয়মিত চর্চার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সাংগঠনিকভাবে এক সুতায় বেঁধে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে এই জোট। এছাড়া জাতীয় দিবস, ঐতিহাসিক ঘটনা ও দেশের বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের স্মরণে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আয়োজন এবং মুক্তচিন্তা, দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। সাংগঠনিক কাঠামোর দিক থেকে জোটের কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলা, মহানগর, উপজেলা ও অন্যান্য স্তরে শক্তিশালী সাংগঠনিক ইউনিট রয়েছে। এর অধীনে বিভিন্ন পেশাভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনও সক্রিয় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী চলচ্চিত্র পরিষদের যে নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে, তা জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি চিত্রনায়ক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বলের অনুমোদনক্রমেই প্রকাশ করা হয়।
বর্তমান নেতৃত্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং কিংবদন্তি চিত্রনায়ক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল বর্তমানে জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতির দায়িত্ব সফলভাবে পালন করছেন।
সংগঠনটির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সম্মেলন ও কাউন্সিল আয়োজনের জন্য একটি শক্তিশালী প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই প্রস্তুতি কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ। সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আইনজীবী ফোরামের ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ইঞ্জিনিয়ার্স ফোরাম বা ইউট্যাবের প্রফেসর ড. মোর্শেদ হাসান খান, সাংবাদিক ফোরাম বা বিএফইউজের কাদের গণি চৌধুরী, স্থপতি ফোরাম বা এ্যাবের ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম তুহিন, ডাক্তার ফোরাম বা ড্যাবের ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের প্রফেসর আবদুস সালাম, এইবির প্রফেসর মোস্তাফিজ, শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের জাকির হোসেন, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের রফিকুল ইসলাম এবং আমরা বিএনপি পরিবারের মোকসেদুল মোমেনিন মিথুন। এই নবগঠিত কমিটির দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করবেন কৃষিবিদ মোকসেদুল মোমেনিন মিথুন।
জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসসহ সমস্ত জাতীয় দিবসগুলো যথাযথ মর্যাদায় পালন করা। এছাড়া কবিতা, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র ও সাহিত্যবিষয়ক বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন, প্রবীণ ও বিশিষ্ট শিল্পী-আকৃতিদের সম্মাননা প্রদান এবং স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। দেশের সমসাময়িক সাংস্কৃতিক ও জাতীয় নানা ইস্যুতে তারা নিয়মিত আলোচনা ও মতবিনিময় সভা করে থাকে।
রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও এই সংগঠনের ভূমিকা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। গত ৩৩ বছর ধরে দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্রান্তিলগ্নে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে এই জোট। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে বিএনপির প্রতিটি কর্মসূচিতে দলটির সংস্কৃতিকর্মীরা সম্মুখভাগে ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বা ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তীব্র সংকটের মুখে যখন দেশ পড়ে, তখন বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ব্যানারে এই জোট প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। এমনকি বিগত ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি, হামলা ও মামলার বিরুদ্ধে রাজপথে সক্রিয় থেকে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ ও জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোট বিএনপির মূল গণআন্দোলনকে প্রতিনিয়ত গতিশীল ও বেগবান করেছে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশে এবং দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এই জোট এক অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।