• সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
বীরগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানে সাজাপ্রাপ্ত চারজন কারাগারে, অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা জেলা পুলিশ সুপারদের ওপর ত্রিমুখী নজরদারি: গোয়েন্দা, স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ সদর দপ্তর ডোমার কেতকীবাড়ীতে টাকা লেনদেনের দ্বন্দ্বে মারপিট, সাবেক ইউপি সদস্য গ্রেফতার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সততার বার্তা নিয়ে পীরগাছা থানায় রংপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক দেবীগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক র‍্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত কচাকাটায় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার এবং অপমৃত্যু মামলা দায়ের পীরগঞ্জে ৭০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি আটক নীলফামারীতে ফিরোজ সাঁই স্মৃতি সংসদ আয়োজিত গুণিজনদের সম্মাননা কালীগঞ্জে ৫ বছরের শিশু ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি বরাতকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব-১৩ পানির সংকটে থাকা তানোরের কৃষকদের ভাগ্যবদল, ধামধুম খাল পরিদর্শনে এসে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা জেলা প্রশাসকের

জেলা পুলিশ সুপারদের ওপর ত্রিমুখী নজরদারি: গোয়েন্দা, স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ সদর দপ্তর

আই জামান চমক, ঢাকা
রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬
ছবি: প্রতিকি

জননিরাপত্তা ও দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করা জেলা পুলিশ সুপারদের সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপর সরকারের নিবিড় নজরদারি সম্প্রতি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পৃথকভাবে তাদের মাঠপর্যায়ের সব ধরনের কার্যক্রমের ওপর এই বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালনকালীন কর্মদক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতার দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নানাভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কোনো পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং কোনো ধরনের বিতর্কিত ভূমিকা গ্রহণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসলেই তাকে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।

এরই ধারাবাহিক অংশ হিসেবে গত মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশের চার জেলার পুলিশ সুপারকে তাদের বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সরাসরি পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। দুটি হত্যাকাণ্ডসহ স্থানীয়ভাবে আলোচিত কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ঝিনাইদহ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো জেলার পুলিশ সুপার মো. মাহফুজ আফজালকে। ছয় মাস আগে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পেয়েছিলেন মো. মাহফুজ আফজাল। গত বৃহস্পতিবার পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত এক বদলি আদেশে তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। সরকারি ওই আদেশে বলা হয়, মো. মাহফুজ আফজাল জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে নিজের দায়িত্বভার অর্পণ করে ৫ জুনের মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে রিপোর্ট করবেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার পদে যোগ দিয়েছিলেন মো. মাহফুজ আফজাল। তার দায়িত্ব পালনকালে ঝিনাইদহ জেলায় দুটি রাজনৈতিক প্রাণহানির ঘটনা, স্থানীয় সামাজিক বিরোধকে কেন্দ্র করে একাধিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ তুলে গণপিটুনিতে একজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে ঝিনাইদহে। তবে সরকারি ওই বদলি আদেশে মো. মাহফুজ আফজালকে প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

এর আগে ফেনী, পঞ্চগড় ও মৌলভীবাজার জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া তিন কর্মকর্তাকে একইভাবে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তর। দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া ওই তিন কর্মকর্তা হলেন ফেনীর মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান, পঞ্চগড়ের মো. মিজানুর রহমান ও মৌলভীবাজারের মো. রিয়াজুল ইসলাম। প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় পুলিশ বাহিনী একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সময় পার করছে। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই বাহিনীর ভাবমূর্তি পুনর্গঠন করা, জনগণের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং পেশাদারিত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে বর্তমান সরকার ও পুলিশ সদর দপ্তর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশ সুপার প্রত্যাহারের মতো কঠোর সিদ্ধান্তকে অনেকে বাহিনীর ভেতরের এক ধরনের শৃঙ্খলাবিষয়ক স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন। আবার অন্য দিকে একের পর এক জেলা পুলিশ সুপার প্রত্যাহারের এই ঘটনায় পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরে কিছু ক্ষেত্রে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার খবরও সামনে আসছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে কোনো কর্মকর্তাকে পদায়নের আগে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে গোপন প্রতিবেদন নেওয়া হয়। সেখানে বিশেষভাবে দেখা হয় তাদের রাজনৈতিক আদর্শ এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানের কোনো মামলা আছে কিনা, সে ব্যাপারেও পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট নেওয়া হয়। এরপর সবকিছু খতিয়ে দেখে ইতিবাচক প্রতিবেদন পাওয়ার ভিত্তিতেই কেবল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়নের জন্য ফিট বা যোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয়।

এদিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় একের পর এক পুলিশ সুপার প্রত্যাহারের ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে নতুন করে নানামুখী আলোচনা ও গুঞ্জন শুরু হয়েছে। এর আগে মে মাসে ফেনী ও পঞ্চগড়ের দুই আলোচিত পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তারও আগে বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপারকে মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ঝিনাইদহ জেলার পুলিশ সুপারকে নিজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে গত শুক্রবারের মধ্যে রিপোর্ট করতে বলা হয়। গত কয়েক মাসে নেওয়া এমন একাধিক সিদ্ধান্তকে সামগ্রিকভাবে পুলিশ বাহিনীর জবাবদিহি ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার এক ধরনের কঠোর বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সম্প্রতি সরকারের প্রশাসনিক নীতিতে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে জেলায় কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের কার্যক্রম এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে। কোনো জেলার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক অভিযোগ কিংবা প্রশাসনিক অসন্তোষ দেখা দিলে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার এক ধরনের স্পষ্ট প্রবণতা বাড়ছে। অবশ্য কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা এই বিষয়ে মনে করেন, মাঠপর্যায়ে ঘন ঘন বদলি বা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের পেশাগত অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। যদি এই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না থাকে, তাহলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

সাবেক কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা এই পরিস্থিতি নিয়ে বলছেন, অতীতে অনেক সময় জেলার পুলিশ সুপারদের বিরুদ্ধে নানা গুরুতর অভিযোগ উঠলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির বেশ কম ছিল। কিন্তু বর্তমানে যেকোনো ধরনের অভিযোগ বা বিতর্ক সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এখন জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছেন যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদই স্থায়ী নয়। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে সামান্যতম ব্যর্থতা বা বিতর্ক তৈরি হলে দ্রুত বদলি বা প্রত্যাহারের ঝুঁকি রয়েছে। তাদের মতে, এই প্রশাসনিক প্রবণতা একদিকে মাঠের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে সতর্ক করছে, অন্যদিকে প্রশাসনের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণও আগের চেয়ে জোরদার করছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যশোর, নীলফামারী, কক্সবাজার ও সুনামগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপারদেরও একইভাবে হঠাৎ দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। ওই সময় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তাদের ঢাকায় রিপোর্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সে সময়কার সেই ঘটনাটিও পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

সাবেক মহাপুলিশ পরিদর্শক আশরাফুল হুদা এই বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের কারণগুলো সবসময় স্বচ্ছভাবে দেখতে হবে। যে সুনির্দিষ্ট কারণে কোনো কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হলো, সেই কারণ যদি বিভাগীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি কোনো কাজের জন্য হয়ে থাকে তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতার জন্য একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা এবং জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করাই হবে এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

জানা যায়, গত ১৪ মে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি তথ্য ছড়িয়ে পড়ে যে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার হতে মো. রিয়াজুল ইসলাম আড়াই কোটি টাকার একটি চুক্তি করেছিলেন একজন তদবিরকারীর সঙ্গে। তবে পুলিশ সুপার হওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী তিনি প্রতিশ্রুত টাকা দিচ্ছেন না। নিয়োগ পাওয়ার পর টাকা না দিয়ে কাজ করে দেওয়া পক্ষকে তিনি নানাভাবে ঘোরাচ্ছেন। অভিযোগ ওঠে, পুলিশ সুপার মো. রিয়াজুল ইসলাম তার এক আত্মীয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়োগ পাওয়ার ঠিক দুই দিন পর ৭ মে ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। বাকি ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা না দিয়ে তিনি নানা ধরনের তালবাহানা করছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আসে যে মো. রিয়াজুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের একজন আজীবন সদস্য। এই পুরো ঘটনাটি পুলিশ সদর দপ্তরের নজরে আসার পর গত ১৫ মে তাকে ১৬ মে’র মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।


More News Of This Category