গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের পাকুরিয়া শরীফ আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন যেন এক নীরব নিস্তব্ধ জনপদ। যেখানে শিশুদের কোলাহলে মুখরিত থাকার কথা, সেখানে এখন শুধুই শূন্যতা। বুধবার সরজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে গিয়ে যে করুণ চিত্র দেখা গেছে, তা উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার এক চরম অব্যবস্থাপনারই বহিঃপ্রকাশ। শ্রেণিকক্ষগুলো পড়ে আছে খাঁ খাঁ অবস্থায়, কোথাও শিক্ষক থাকলেও নেই কোনো শিক্ষার্থী। আবার কোথাও হাজিরা খাতায় নাম থাকলেও বাস্তবে বেঞ্চগুলো পড়ে আছে শূন্য। এই চিত্র কোনো বিশেষ দিনের নয়, বরং নিয়মিতভাবেই স্কুলটি শিক্ষার্থী হারিয়ে মৃত্যুঘণ্টা বাজছে।
উপস্থিতি রেজিস্টার আর বাস্তবের গরমিল দেখলে যে কেউ অবাক হবেন। নথিপত্র অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণিতে ১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩ জনের উপস্থিতি দেখানো হলেও শ্রেণিকক্ষে একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। চতুর্থ শ্রেণির ১৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে দেখা মিলেছে মাত্র ৪ জনের। আর পঞ্চম শ্রেণিতে ১৪ জনের বিপরীতে উপস্থিত ছিল মাত্র ৫ জন। সব মিলিয়ে ৩৯ জন শিক্ষার্থীর এই বিদ্যাপীঠে উপস্থিতির সংখ্যা এক অঙ্কে নেমে আসায় স্বাভাবিক পাঠদান পুরোপুরি থমকে গেছে। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন স্থবির পরিবেশ শিক্ষক ও স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনের তদারকির অভাবকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পরিদর্শনের সময় প্রধান শিক্ষক শাহনাজ পারভীন মাসিক সমন্বয় সভায় যোগ দিতে বিদ্যালয়ের বাইরে ছিলেন। বর্তমানে ৫ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও তাদের পাঠদান প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত ঢিলেঢালা। শুধু শিক্ষার্থী সংকটে নয়, বিদ্যালয়টি বর্তমানে প্রশাসনিকভাবেও এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রধান শিক্ষক শাহনাজ পারভীনের বিরুদ্ধে এর আগে বিভিন্ন খাতের বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, যার প্রেক্ষিতে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত বা সাসপেন্ড করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি পুনরায় দায়িত্বে ফিরলেও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ কমেনি। এলাকাবাসীর দাবি, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশে। অভিভাবকরা এখন আর ভরসা পাচ্ছেন না তাদের সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে পাঠাতে।
স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিত করার জন্য কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর মনিটরিং নেই। শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হলেও দায়সারা কাজ করে সময় পার করছেন, যার ফলে শিক্ষার্থীরা ক্রমেই বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে পড়ছে। অভিভাবকদের মতে, একজন সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক যখন পুনরায় দায়িত্বে ফেরেন এবং অনিয়মের অভিযোগগুলো অমীমাংসিত থাকে, তখন প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বলে আর কিছু থাকে না। এই ঘটনার পর থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষা-বান্ধব পরিবেশ একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে বলে তারা মনে করেন।
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার শায়লা সাঈদ ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার নাসরিন আক্তার জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষকের আর্থিক অনিয়মসহ বিদ্যালয়ের এই বেহাল দশা সম্পর্কে তারা অবগত। সামগ্রিক অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তারা আশ্বস্ত করেছেন। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু আশ্বাসে কাজ হবে না। দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং কঠোর তদারকি ছাড়া পাকুরিয়া শরীফ আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি এভাবে দুর্বল হতে থাকলে একটি প্রজন্ম অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে, তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।