আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: রংপুরের গঙ্গাচড়ায় নদীর বুক চিরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানার সংবাদ প্রকাশ করায় এক সংবাদকর্মীর ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। সত্য তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার অপরাধে এমন আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে পেশাদার ওই সাংবাদিককে। গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের উমর বাজার এলাকায় সংঘটিত এই ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। হামলায় গুরুতর আহত সাংবাদিককে স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।
হামলার শিকার সাংবাদিক আব্দুল বারী দুলাল দৈনিক প্রতিদিনের বার্তার গঙ্গাচড়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তিনি গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রেসক্লাবের সহসভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসকদের সূত্রে জানা গেছে, হামলায় তাঁর মাথার পেছনের অংশে প্রচণ্ড আঘাত লাগে এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। উমর বাজারে সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতেই ঘটে যাওয়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পেশাগত সাংবাদিকতার নিরাপত্তার ওপর এক বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান করে জানা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর গজঘণ্টা ইউনিয়নের উমর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে একটি শক্ত অভিযান পরিচালনা করেছিলেন গঙ্গাচড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি হামিদুর ইসলাম। প্রচলিত ভূমি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশসংক্রান্ত আইনের আওতায় পরিচালিত ওই বিশেষ অভিযানে দায়ীদের ত্রিশ হাজার টাকা জরিমানা করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন কর্মকাণ্ড না করার মুচলেকা নেওয়া হয়। ওই আইনগত পদক্ষেপের খবর দৈনিক প্রতিদিনের বার্তাসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশিত হয়। আর সেই সংবাদের জেরে ক্ষুব্ধ হয়েই সাংবাদিক আব্দুল বারী দুলালের ওপর এই হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আহত সাংবাদিকের বিবরণ অনুযায়ী, শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি যখন উমর বাজারে অবস্থান করছিলেন, ঠিক সে সময় কামরুল হাসান ও আমানুল্লাহ আমানসহ কয়েকজন ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে এসে তাঁর ওপর হামলা চালায়। প্রত্যক্ষভাবে তাঁকে পরাস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে মাথার স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করা হয়, যার ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই রক্তাক্ত অবস্থায় গড়িয়ে পড়েন। তবে হামলার সরাসরি অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে ঘটনার কারণ বা বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ধরনের বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ঘটনার ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়লে গঙ্গাচড়ায় কর্মরত সর্বস্তরের সাংবাদিক, দৈনিক প্রতিদিনের বার্তার নির্বাহী সম্পাদক, গঙ্গাচড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুছ সবুর, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ গঙ্গাচড়া উপজেলা শাখার নেতৃবৃন্দ এবং সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান এবং চিকিৎসাধীন সাংবাদিকের সার্বিক শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত সাংবাদিক সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা দেখা যায়।
এই ন্যাক্কারজনক হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই রংপুর বিভাগজুড়ে প্রতিবাদ ঝড় ওঠে। রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন, গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রেসক্লাব, গঙ্গাচড়া প্রেসক্লাব, রংপুর প্রেসক্লাব, রংপুর সদর উপজেলা প্রেসক্লাব ও মিঠাপুকুর প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংবাদকর্মী সংগঠন একযোগে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের অনতিবিলম্বে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দৈনিক প্রতিদিনের বার্তার নির্বাহী সম্পাদক স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করার অপরাধে যদি কোনো সংবাদকর্মীকে এভাবে সহিংসতার শিকার হতে হয় এবং হামলাকারীরা শাস্তি না পেয়ে ছাড় পেয়ে যায়, তবে সেটি মুক্ত গণমাধ্যমের স্বাভাবিক চলাচলের পথকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে।
এদিকে রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও যমুনা টেলিভিশনের ব্যুরো চিফ সরকার মাজহারুল মান্নান এই হামলাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করার একটি জঘন্য অপচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের জোরালো দাবি জানান এবং পাশাপাশি পরিবেশ ধ্বংসকারী অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল চক্রের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোরতম পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। তবে এই বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের চূড়ান্ত অগ্রগতির বিষয়ে গঙ্গাচড়া থানার পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839