আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত কৃষকের কাছে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে ‘সার বিতরণ কার্ড’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের পরিচয়, জমির পরিমাণ ও কৃষি-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করে নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় উদ্যোগটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন স্থানীয় প্রকৃত কৃষকেরা।

সম্প্রতি প্রণীত সার বিতরণ কার্ডের নমুনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, এতে কৃষকের নাম, পিতা-মাতার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, কৃষকের শ্রেণি, জমির পরিমাণ, নিজস্ব আবাদি জমি এবং বর্গা বা লিজের জমির তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন, ব্লক ও ওয়ার্ডের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। ফলে কোন কৃষকের কত জমি এবং তার কৃষি উৎপাদনের পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সার পাওয়ার বিষয়টি যাচাই করা সহজ হবে।
কার্ডের শর্তাবলিতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, একজন কৃষক একটি নির্দিষ্ট সার বিতরণ কার্ডই ব্যবহার করবেন এবং একই কৃষকের নামে একাধিক কার্ড গ্রহণের সুযোগ নেই। কার্ডে থাকা তথ্য সঠিক থাকা বাধ্যতামূলক। সার ক্রয়ের সময় কৃষককে কার্ড ও প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে। অন্যের কার্ড ব্যবহার করে সার কেনা যাবে না এবং কার্ড হস্তান্তর বা বিক্রিও করা যাবে না। এ উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রকৃত কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর একটি শনাক্তযোগ্য কাঠামো তৈরি করা। দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের অভিযোগ, সার সংকটের সময় প্রকৃত চাষিরা অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সার পান না; অন্যদিকে একটি অংশ অতিরিক্ত সার সংগ্রহ করে মজুত বা বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করে। কৃষকের তথ্যভিত্তিক কার্ড ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এ ধরনের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

কার্ডের শর্ত অনুযায়ী মাসিক বরাদ্দের ভিত্তিতে সার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার সংগ্রহ ও অবৈধ মজুতের সুযোগও কমার কথা। একই সঙ্গে ভুল তথ্য, জালিয়াতি কিংবা অনিয়মের মাধ্যমে সার গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেলে কার্ড বাতিলসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
তবে কার্ড তৈরি করাই শেষ কথা নয়। কৃষকের প্রকৃত জমির পরিমাণ, চাষাবাদের ধরন, বর্গা বা লিজের জমির তথ্য এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য নির্ভুলভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কার্ড তৈরি হলে প্রকৃত কৃষক আবারও বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে কৃষকদেরও সচেতন হতে হবে। কার্ড তৈরির সময় নিজের নাম, পিতা-মাতার নাম, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জমির পরিমাণ ও ঠিকানা ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। কোনো তথ্য ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তাকে জানিয়ে সংশোধন করতে হবে। কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে কার্ড বা ব্যক্তিগত তথ্য তুলে দেওয়া উচিত নয়।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মির হাসান আল বান্না বলেন, মাটি বুঝে সার, কার্ড বুঝে বরাদ্দ দেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, সার কার্ড ব্যবস্থার সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বেশি সার ব্যবহার করলেই বেশি ফলন হবে, এমন ধারণা থেকে কৃষকদের বেরিয়ে আসতে হবে। মাটি পরীক্ষা করে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া, টিএসপি বা ডিএপি, পটাশসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কার্ডভিত্তিক সার বিতরণ যদি মাটি পরীক্ষা ও ফসলভিত্তিক সার সুপারিশের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়, তাহলে এর সুফল আরও বাড়বে। এতে একদিকে কৃষকের অপ্রয়োজনীয় সার কেনার খরচ কমবে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা রক্ষার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতাও টেকসই করা সম্ভব হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ডিমলার প্রকৃত কৃষকদের প্রত্যাশা, সার কার্ড তৈরির এই উদ্যোগ যেন শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে। কার্ডধারী প্রকৃত কৃষক যেন সময়মতো, ন্যায্য ব্যবস্থায় এবং নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় সার পান, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়। কৃষকদের ভাষায়, কার্ড যদি প্রকৃত কৃষককে চিহ্নিত করে এবং সেই অনুযায়ী সার নিশ্চিত করে, তাহলে এটি কৃষকের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান, কার্ড তৈরির পাশাপাশি এর ডাটাবেজ সংরক্ষণ, তথ্য যাচাই, ইউনিয়ন ও ব্লক পর্যায়ে স্বচ্ছতা, সার বিক্রেতার তদারকি এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। কারণ সার কার্ড শুধু একটি কাগজ নয়, এটি হতে পারে প্রকৃত কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। আর সেই হাতিয়ার সফল হবে তখনই, যখন কার্ড থাকবে প্রকৃত কৃষকের হাতে, সার যাবে প্রকৃত জমিতে এবং কোনো অনিয়মের সুযোগ থাকবে না।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839