আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলায় প্রান্তিক শিশুদের পড়াশোনাকে আরও আনন্দময় ও সহজ করে তুলতে শুরু হয়েছে পাঠ্যক্রম ভিত্তিক নাট্য ভাবনায় সিলেবাস থিয়েটার কার্যক্রম। সোমবার উপজেলার সারিয়ালজোত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোসা: শুকরিয়া পারভীন। পঞ্চগড় জেলা প্রশাসনের অনন্য এই উদ্যোগটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়ন বিষয়ক সংগঠন কারিগর। এই বিশেষ কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রান্তিক এলাকার যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীরা এতদিন পর্যাপ্ত সাংস্কৃতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল, তাদেরকে পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন বিষয়বস্তু নাটকের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে শেখানো এবং নিজেদের স্কুল মাঠেই তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা।
স্কুলের গতানুগতিক শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়ে এই থিয়েটার কার্যক্রম চালুর আগে শিক্ষার্থীদের সার্বিক প্রস্তুতির জন্য টানা সাত দিনের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। বিদ্যালয়টির প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পাঁচটি শ্রেণী থেকে ২৫ জন উৎসাহী শিক্ষার্থীকে বাছাই করে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি সক্রিয় থিয়েটার ক্লাব। এই সাত দিনের নিবিড় প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থীদের শুধু অভিনয়েই দক্ষ করা হয়নি, বরং তাদের পাঠ্যক্রমে থাকা বিভিন্ন গল্প ও কবিতার মধ্য দিয়ে জীবনমুখী নানা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। অনুশীলনের মাধ্যমে তাদের শেখানো হয়েছে মেডিটেশন, শারীরিক ব্যায়াম, সঠিক ও স্পষ্ট উচ্চারণ, সবার সামনে সাবলীলভাবে কথা বলার পদ্ধতি, অভিনয় শৈলী, মন দিয়ে গল্প পাঠের কৌশল, সঙ্গীতের ঝংকার, সুষম খাদ্যাভ্যাস, প্রকৃতির যত্ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং ইতিবাচক আচরণের মতো মানবিক গুণাবলী। প্রশিক্ষণ শেষে এই কচি-কাঁচা মনের খুদে শিল্পীরা নিজেদের ভাবনায় একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক তৈরি করে এবং নিজেরাই সেখানে দক্ষ অভিনেতার মতো অভিনয় করে দেখায়। উদ্যোগের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন যে এই শিক্ষণীয় প্রক্রিয়াটি নিয়মিত চলমান থাকবে এবং থিয়েটার ক্লাবের এই ধারার সাথে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীরাও নতুনভাবে যুক্ত হতে পারবে।
উদ্বোধনী দিনের রঙিন আয়োজনে সারিয়ালজোত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নবগঠিত থিয়েটার ক্লাব সারিয়াল থিয়েটার পরিবেশন করে তাদের প্রথম নাট্য প্রযোজনা বাঁশিওয়ালা। দর্শকপ্রিয় এই নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন নাট্যকার সরকার হায়দার। নাটকটিতে অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণবন্ত অভিনয় করে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে খুদে শিল্পী আরুশা, সারা, আশরাফি, রোমিও, মেহেদী, সাদিকুল, জেসিকা, রিমি, জান্নাতি, মনি, রাতুল, ইমরান, সোহান, বাইজিদ, নিহাদ, হ্যাপি, সামিয়া, ইতি, ফয়সাল, সৌরভ ও মাহিম। নাটকটির সার্বিক রূপায়ণ ও ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করেন হাবিবুর রহমান (হাবিব), অর্থবহ প্রযোজনায় ছিলেন রেজাউল ইসলাম, শিশুদের উপযুক্ত পোশাক ও প্রপস পরিকল্পনা করেন ফাহিম আহমেদ এবং আবহ সঙ্গীতের মিষ্টি পরিকল্পনায় ছিলেন রইসউদ্দিন।
সংগঠন কারিগরের নির্বাহী পরিচালক সরকার হায়দার জানান, দেশের সুদূর প্রান্তিক এলাকার শিশুরা সচরাচর সুস্থ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উপভোগ করার খুব একটা সুযোগ পায় না। অথচ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমের ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে নানারকম বিচিত্র ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উপাদান। এই স্কুল সিলেবাস থিয়েটার কার্যক্রমের ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা আনন্দের সাথে নিজেদের বইয়ের পাঠ উপভোগ করতে পারছে, ঠিক তেমনি তাদের অভিভাবক ও স্থানীয় এলাকার সুধীজনরাও একসাথে মাঠে বসে শিশুদের পরিবেশনা উপভোগ করতে পারছেন। জেলা প্রশাসনের এই চিন্তাটিকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও অনন্য উদ্যোগ উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, পাইলট প্রকল্প হিসেবে বর্তমানে তেঁতুলিয়া উপজেলার মোট ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই থিয়েটার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শন শেষে আগামীতে এই ১০টি স্কুলের ১০টি নাটক নিয়ে একটি যৌথ নাট্য উৎসবের বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোসা: শুকরিয়া পারভীন বলেন, থিয়েটার হলো শিল্পকলার একটি পূর্ণাঙ্গ বা সমন্বিত মাধ্যম। এটি কেবল নিছক থিয়েটার, অভিনয় বা বিনোদনের বিষয় নয়। একজন সুস্থ ধারার অভিনেতাকে সুনাগরিক হয়ে উঠতে নানা ধরনের ভালো যোগ্যতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হয়। তার দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস, পরিচ্ছন্ন পোশাক-আশাক এবং মার্জিত কথা বলা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শিল্প ও সুশিক্ষাকে অনুসরণ করতে হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে থিয়েটারের এই বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ সমাজের সকল মানুষের জীবন যাপনের জন্যই একটি অনুকরণীয় ও শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে। অন্যদিকে, নাটকের এই নান্দনিক মাধ্যমে যদি স্কুলের কঠিন পাঠ্যক্রমের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে গ্রামের প্রান্তিক শিশুদের হাতে কলমে পাঠদান করা যায়, তবে খুব সহজেই শিশুদের ভেতরের আত্মবিশ্বাস জেগে উঠবে। এটি তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে সাহায্য করবে এবং তাদের নিজস্ব সৃজনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
উৎসবমুখর এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইমাম রাজী টুলু, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সীমা শারমিন, তেঁতুলিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর আলম এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির প্রতিনিধি মকবুলার রহমান। এছাড়া সারিয়ালজোত গ্রামের স্থানীয় সহস্রাধিক প্রাথমিক শিক্ষক, কোমলমতি শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক ও এলাকার সুশীল সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মাঠজুড়ে উপস্থিত থেকে শিশুদের এই চমৎকার নাটকটি উপভোগ করেন এবং হাততালি দিয়ে ছোট ছোট শিল্পীদের উৎসাহিত করেন।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839