• মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম
ডোমারের চিলাহাটিতে ১০ পিস ট্যাপেন্টাডলসহ চিহ্নিত মাদক কারবারি গ্রেফতার ডোমারে চাঞ্চল্যকর একরামুল হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইয়ানুর ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার ডোমারে স্বামীর পরকীয়ায় বাধা দেওয়ায় গৃহবধূকে পিটিয়ে গুরুতর জখমের অভিযোগ রংপুরে অপহৃত স্কুলছাত্রী উদ্ধার, প্রধান আসামিসহ গ্রেপ্তার ৫ ওজনে কম ও বেশি দামে পণ্য বিক্রির দায়ে রংপুরে ২ প্রতিষ্ঠানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বীরগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশে নারী স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত জামালপুরের রাণীগঞ্জে বসতঘর থেকে ২০ কেজি গাঁজাসহ মাদক কারবারি আটক চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকি রোধে বেনাপোলে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর কঠোর বার্তা পঞ্চগড়ে প্রান্তিক শিশুদের জন্য পাঠ্যক্রমভিত্তিক স্কুল সিলেবাস থিয়েটার কার্যক্রম শুরু ঘোড়াঘাটে ১৯৯০ পিস ইয়াবাসহ ঝালকাঠির যুবক গ্রেপ্তার

সারা দেশে পুলিশের ওপর হামলা বৃদ্ধি, সাত মাসে আহত ৩৬১ সদস্য

সংবাদদাতা:
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

 

 

আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিনিয়তই সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী ও অপরাধীদের হামলার শিকার হচ্ছেন তারা। আসামিদের গ্রেফতার বা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় বাধা দিতে গিয়ে রক্তাক্ত হচ্ছেন আইনরক্ষকরা। সম্প্রতি রাজধানীর অদূরে সাভারে সন্ত্রাসীদের নির্মম হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের উপ-পরিদর্শক আলতাফ হোসেন। এই মর্মান্তিক ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে।

 

পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে সারা দেশে অন্তত ৩৬১ জন পুলিশ সদস্য বিভিন্ন হামলায় আহত হয়েছেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ৮২ জন, মার্চে ৬৩ জন, এপ্রিলে ৬৬ জন, মে মাসে ৫৫ জন, জুনে ৫১ জন এবং জুলাই মাসে ৪২ জন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে খোদ রাজধানী ঢাকায়।

 

এর আগের বছরের চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক ছিল। সে বছর দায়িত্ব পালনকালে মোট ৬০১ জন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হন। মাসের হিসাবে জানুয়ারিতে ৩৮, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭, মার্চে ৯৬, এপ্রিলে ৫২, মে মাসে ৬২, জুনে ৪৪, জুলাইয়ে ৩৯, আগস্টে ৫১, সেপ্টেম্বরে ৪৩, অক্টোবরে ৬৯, নভেম্বরে ৪১ এবং ডিসেম্বরে ৪১ জন সদস্য আহত হয়েছিলেন।

 

সাভারে উপ-পরিদর্শক আলতাফ হোসেনকে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পরিদর্শক কামরুল ইসলাম তালুকদার জানিয়েছেন, একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে পুলিশের মনোবল ভেঙে দিতেই তাদের ওপর হামলা ও লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটাচ্ছে। যারা পুলিশকে দুর্বল মনে করে আঘাত করছে, তাদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, পুলিশ জনগণের কল্যাণের জন্যই কাজ করে। তাই পুলিশের ওপর হামলা হলে জনগণের উচিত তা প্রতিহত করা এবং পুলিশের পেশাগত কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা।

 

২০২৪ সালের পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে পুলিশের ওপর আক্রমণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ছিনতাইকারী এবং উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর হামলার শিকার হচ্ছেন তারা। চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পকেট গেট এলাকায় পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে একদল যুবক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং এক পুলিশ কনস্টেবলকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি ককটেল ও বোমাভর্তি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজমের তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, নব্য জেএমবির সন্ত্রাসীরা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

 

একইভাবে, মে মাসে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে ধানমন্ডি থানা পুলিশের একটি দল হামলার মুখে পড়ে। বাধ্য হয়ে গুলি চালালে এক ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয়। এর আগে পল্লবী থানার ওসি নজরুল ইসলামসহ পুলিশের তিন কর্মকর্তা আহত হয়েছিলেন। মার্চ মাসে যাত্রাবাড়ীর সায়েদাবাদে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমান গুলিবিদ্ধ হন। রায়েরবাজারে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় পুলিশের চার সদস্য গুরুতর আহত হন, যাদের মধ্যে রয়েছেন উপ-পরিদর্শক আফজালুর রশিদ, জসীমউদ্দীন, খোরশেদ আলম ও সোহেল।

 

শুধু রাজধানীতেই নয়, ঢাকার বাইরেও এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত শনিবার চট্টগ্রামের ওয়্যারলেস মোড়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন বগাকে গ্রেফতার করতে গিয়ে পুলিশ আক্রান্ত হয়। হামলাকারীদের ককটেল ও ইটপাটকেলের আঘাতে খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। সম্প্রতি চট্টগ্রামে আরেক সন্ত্রাসীকে ধরতে গিয়েও পুলিশ সদস্যরা গুলিবিদ্ধ হন। পটুয়াখালীর লাউকাঠিতে দুই পক্ষের সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে শহিদুল ইসলাম নামে এক পুলিশ সদস্য রামদার কোপ ও রডের আঘাতে মারাত্মক জখম হন।

 

হামলা চালিয়ে হেফাজত থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটছে। গত ২ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে আসির মিয়া নামের এক আসামিকে হাতকড়া পরিয়ে নেওয়ার সময় তার সহযোগীরা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেয়। পালিয়ে গিয়ে সেই আসামি হাতকড়া পরা অবস্থায় ফেসবুক লাইভেও আসে। তবে পরদিন গোয়েন্দা ও সদর থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। এর আগে জুলাই মাসে নরসিংদীর চরাঞ্চলে হত্যা মামলার আসামি সেলিম মুন্সিকে থানায় নেওয়ার পথে স্থানীয়রা লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। বছরের শুরুতে ময়মনসিংহ এবং বাগেরহাটেও পুলিশের ওপর হামলা করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর এবং মৌলভীবাজারেও এমন খবর পাওয়া গেছে।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এমন ধারাবাহিক হামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী নাসির উদ্দিন সম্রাট। তিনি বলেন, আইনের রক্ষকরাই যদি নিরাপদ না থাকেন, তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে অপরাধী চক্র যেভাবে পুলিশের ওপর হামলা করছে, তা ঠেকাতে ঊর্ধ্বতনদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে জড়াচ্ছে, যার ফলে বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমছে এবং অপরাধীদের সাহস বাড়ছে। অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের মাঝেও আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।

 

সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম এই পরিস্থিতির জন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই দুষছেন। তিনি বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করেছে। বর্তমান সরকারের আমলেও কেন পুলিশের ওপর হামলা হচ্ছে তা নিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, পুলিশকে আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে, অন্যথায় সমাজে আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু থাকবে সমাধানে। নরসিংদীর একটি ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, পুলিশ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই।

 

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিয়াউল হক বলেন, আসামিরা পুলিশের ওপর হামলা করলে পরবর্তী অভিযানে যাওয়ার আগে কর্মকর্তাদের অনেকবার ভাবতে হয়। নাগরিক সমাজের কল্যাণে কাজ করা পুলিশ সদস্যদের প্রতি সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

 

অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক শিহাব কায়সার খানও জনগণের সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। সাভারের মর্মান্তিক ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিচয় দেওয়ার পরও পুলিশ কর্মকর্তার ওপর এমন নির্মম হামলা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুলিশ যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এ ধরনের ঘটনা তাদের কাজের পথে বড় বাধা।

 

গত মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, গত ছয় মাসে বাহিনীর অবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং সদস্যরা পূর্ণশক্তি দিয়ে অপরাধ দমনে কাজ করছেন। পুলিশকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। তবে বাস্তবে পুলিশের ওপর চলমান এই হামলাগুলো বাহিনীর সার্বিক নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন রেখে যাচ্ছে।

 

এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839


এরকম আরও সংবাদ