আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: একজন চিকিৎসকের জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা অনেক সময় তার নিজের জীবনের গভীর কোনো বেদনা থেকে তৈরি হয়। আপনজনকে হারানোর কষ্ট মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। ঠিক তেমনই এক বেদনার অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিয়ে এসেছেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. জাকির হোসেন। নিজের বাবা-মাকে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো জটিলতায় হারানোর পর তিনি সংকল্প করেছিলেন, অর্থাভাবে বা অবহেলায় আর কাউকে যেন এভাবে প্রিয়জন হারাতে না হয়। সেই মানবিক তাড়না থেকেই তিনি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন চিকিৎসাসেবা। স্টাফ রিপোর্টার রাহেনা বারী আয়না নীলফামারীর ডিমলা থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন।

মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ডা. জাকির হোসেন রংপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার। শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থানেই নয়, তিনি বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও সচেতনতামূলক ক্যাম্প পরিচালনা করে আসছেন। এসব ক্যাম্পে সাধারণ মানুষের ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ পরীক্ষা করা হয়। একইসঙ্গে বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই নির্ণয় করে চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ দেওয়া হয়। রোগীদের নিবন্ধন করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশিকা ও সঠিক জীবনযাপনের পরামর্শ প্রদান করা হয় এসব ক্যাম্প থেকে।
এরই ধারাবাহিকতায় নীলফামারীর ডিমলায় আয়োজন করা হয়েছে এমনই একটি জনকল্যাণমূলক ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার ডিমলা উপজেলা পরিষদ চত্বরে এই ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে এই চিকিৎসাসেবা। ডিমলা উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং রংপুরের হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের সার্বিক সহযোগিতায় এই ক্যাম্প পরিচালিত হবে। যারা নিজেরা ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন অথবা পরিবারের মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে যারা এসব রোগের ঝুঁকিতে আছেন, তাদের সবাইকে এই ক্যাম্পে নিয়ে আসার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে।

আমাদের সমাজে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসকে অনেকেই সাধারণ রোগ ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই রোগগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে তা হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতা থেকে শুরু করে চোখের মারাত্মক সমস্যাসহ নানা গুরুতর শারীরিক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, অনেক মানুষের শরীরে এই রোগগুলো বাসা বাঁধলেও প্রাথমিক পর্যায়ে তারা কোনো লক্ষণ বুঝতে পারেন না। তাই বড় কোনো বিপদ হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার চেয়ে আগে থেকেই পরীক্ষা করে ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।
ডা. জাকির হোসেনের এই উদ্যোগের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো তিনি চিকিৎসাকে কেবল হাসপাতাল বা চেম্বারের চার দেয়ালে বন্দি রাখেননি। তিনি চিকিৎসাকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার এক নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবার এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য এমন বিনামূল্যে ক্যাম্প রোগ শনাক্তকরণ ও সঠিক পরামর্শ পাওয়ার এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দেয়। বাবা-মায়ের চিকিৎসার অভাবজনিত মৃত্যুর শোক তাকে কেবল কাঁদিয়ে যায়নি, বরং তাকে এক বৃহত্তর দায়িত্ববোধের সামনে দাঁড় করিয়েছে। নিজের পরিবারের সেই অপূর্ণতা থেকে তিনি শিক্ষা নিয়েছেন যেন অন্য কোনো পরিবারকে চিকিৎসার অভাবে প্রিয়জন হারানোর কান্না কাঁদতে না হয়।
একজন মানুষের ব্যক্তিগত কষ্ট যখন সমাজের কল্যাণে কাজে লাগে, তখন তা হাজারো মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। ডা. জাকির হোসেনের এই মানবিক উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, চিকিৎসকের কাজ শুধু রোগ সারানোই নয়, রোগ হওয়ার আগেই মানুষকে সচেতন করাও চিকিৎসার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডা. ওয়াছিম-ওয়ালেদা বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে এই বিনামূল্যের চিকিৎসাসেবা আরও বেশি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ডিমলা উপজেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত এই ক্যাম্পটি শুধু বিনামূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পরামর্শ নেওয়ার জায়গা নয়, এটি প্রত্যেক মানুষের নিজের এবং পরিবারের স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে সচেতন হওয়ার একটি দারুণ সুযোগ। সময় থাকতে রক্তচাপ মাপুন, ডায়াবেটিস পরীক্ষা করুন এবং নিজের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জেনে নিন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সুস্থ জীবনযাপনের প্রস্তুতি নিন। কারণ, সচেতনতাই পারে বড় কোনো রোগের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে। একজন সন্তানের বাবা-মাকে হারানোর শোক আজ সমাজের হাজারো মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সচেতনতার এক বিশাল ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সত্যিই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839